পরিমাপের প্রয়োজনীয়তা

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তো পরিমাপ প্রতিনিয়তই করতে হয়। যেমন, আমরা যখন বাজার-সদাই করি, পোশাক তৈরি করি বা খেলাধুলার সময় গোলপোস্টের মাপ বা ওয়াইডের দাগ ঠিক করি, তখন বিভিন্নভাবে আমাদের পরিমাপ করতে হয়।

বৈজ্ঞানিক গবেষণাতে বর্তমানে পরিমাপ অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেমন মনে করা যাক নতুন মডেলের একটা গাড়ির ইঞ্জিন তৈরি করা হচ্ছে। ইঞ্জিন কীভাবে কাজ করে, এটা নিয়ে কিন্তু আমরা অতীতের বিভিন্ন গবেষণা থেকে জেনে নিতে পারবো, নতুন করে গবেষণার দরকার হবে না। কিন্তু ইঞ্জিনটাকে যদি আরো সাশ্রয়ী বা আরো দ্রুতগতির করতে হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের কোন ডিজাইনে কীরকম জ্বালানি খরচ হচ্ছে, কত দ্রুত গতি তুলতে পারছে- এরকম পরিমাপগুলো করা দরকার হবে। তো এই উদাহরণ থেকে আমরা চিন্তা করতে পারি বর্তমান সময়ের গবেষণাগুলোতে পরিমাপ অনেক বেশি অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে।

রাশির ধারণা

আমরা যা কিছু পরিমাপ করতে পারি, তাকে আমরা রাশি বলি। যেমন, একটা টেবিলের দৈর্ঘ্য, একটা কাজ করতে প্রয়োজনীয় সময়, একটা গাড়ির গতি, একটা মোমবাতির আলোর উজ্জলতা, কোন জায়গার তাপমাত্রা প্রভৃতি। তো এই জিনিসগুলো হলো রাশি (ইংরেজিতে Quantity)।

মৌলিক রাশি ও যৌগিক রাশি

আমরা ক্ষেত্রফলের সূত্র পড়েছি। ক্ষেত্রফল = দৈর্ঘ্য × প্রস্থ। দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ তো আলাদা কিছু না, একটা একটু ছোট, আরেকটা একটু বড়- তাই আমরা ভিন্ন নাম দিয়েছি। তো সেই হিসেবে আমরা বলতে পারি দুটো দৈর্ঘ্য গুণ করে ক্ষেত্রফল হয়।

একইভাবে একটা গাড়ির বেগ চিন্তা কর। একটা গাড়ি ঘন্টায় ৬০ কিলোমিটার বেগে চালানো হচ্ছে। দেখো, তাহলে এই বেগ আলাদা কোন কিছুই নয়, নির্দিষ্ট সময়ে কতটুকু দৈর্ঘ্য যাচ্ছে, এটাই।

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি অন্য বিভিন্ন রাশির সমন্বয়ে নতুন রাশি তৈরি হয়। তো আমরা যে রাশিগুলোর পরিমাপ করি, তার মধ্যে ৭টি রাশিকে আমরা স্বাধীন চিন্তা করি- অর্থাৎ অন্য কোন রাশির সমন্বয়ে তৈরি হয়নি। অন্য রাশিগুলোকে এই ৭টি রাশির সমন্বয়ে ব্যাখ্যা করি।

মৌলিক রাশি: যে রাশিগুলো আমরা অন্য কোন রাশির ওপর নির্ভরতা ছাড়া স্বাধীন হিসেবে চিন্তা করি, সে রাশিগুলো মৌলিক রাশি।

যৌগিক রাশি: একাধিক মৌলিক রাশির সমন্বয়ে যে রাশিগুলো গড়ে উঠেছে সেগুলো যৌগিক একক।

মৌলিক ৭টি রাশি হলো: দৈর্ঘ্য, ভর, সময়, তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ প্রবাহ, আলোক ঔজ্জ্বল্য ও পদার্থের পরিমাণ

পরিমাপে এককের প্রয়োজনীয়তা

আমি যদি বলি আমার বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব ২০, তাহলে তুমি কী বুঝবে? অর্থবহ কোন কিছু কিন্তু এখান থেকে বোঝা সম্ভব হবে না। ২০ কিলোমিটার হতে পারে, ২০ মিনিটের রাস্তা হতে পারে, ২০ পা দূরত্ব হতে পারে- এমন অনেক কিছু সম্ভব। যখন আমরা এর একটা নির্দিষ্টভাবে বলবো, তখনই কেবল কথাটা অর্থবোধক হয়ে উঠবে।

আমরা যখন বলছি ২০ কিলোমিটার, তার মানে হলো ১ কিলোমিটার দূরত্ব যতটা বোঝায়, তার ২০ গুণ। আমরা যদি ২০ মিনিটের রাস্তা বলি, তার মানে হলো ১ মিনিটে যতটুকু যাওয়া যায়, তার ২০ গুণ। মানে কিছু একটার সাথে তুলনা করে আমাদের পরিমাপ করতে হয়, যেই ‘কিছু একটা’ কতটুকু এটা অন্যরা বুঝতে পারে।

তাতেও একটা সমস্যা থেকে যাচ্ছে। ২০ মিনিটের রাস্তা বললে সবাই তো প্রতি মিনিটে সমান দূরত্ব পাড়ি দিতে পারবে না, কমবেশি হবে। অথবা ধরা যাক ফুটবল খেলার সময় পা দিয়ে মেপে ১০ পা দৈর্ঘ্যের গোলপোস্ট তৈরি করলে। সবার পায়ের মাপ তো সমান হবে না। দৈনন্দিন জীবনে এরকম বিভিন্ন একক আমরা ব্যবহার করি, যাতে আমাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনগুলো চলে যায়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণাসহ আনুষ্ঠানিক বিভিন্ন প্রয়োজনে আরেকটু সুনির্দিষ্ট একক প্রয়োজন, যার অর্থ সবাই সমানভাবে বুঝতে পারে।

মৌলিক একক ও যৌগিক একক

মৌলিক রাশিগুলোর একককে, অর্থাৎ অন্যান্য এককের ওপর নির্ভরতা ছাড়া স্বাধীন এককগুলোকে মৌলিক একক বলে। মৌলিক রাশির মতই মৌলিক এককের সংখ্যা ৭টি। যেমন- দৈর্ঘ্যের একক, ভরের একক, সময়ের একক, তাপমাত্রার একক, বিদ্যুৎ প্রবাহের একক, আলোক ঔজ্জ্বল্যের একক ও পদার্থের পরিমাণের একক।

অন্যদিকে যৌগিক রাশির একক, অর্থাৎ একাধিক মৌলিক এককের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এককগুলোকে যৌগিক একক বলে। যেমন- ক্ষেত্রফলের একক, বেগের একক প্রভৃতি।

এককের আন্তর্জাতিক পদ্ধতি

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পরিস্থিতি অনুযায়ী অনেকরকম একক ব্যবহার করলেও যখন আরেকটু বড় পরিসরে কোন প্রয়োজন হবে, তখন এমন একক দরকার যেটা সবার কাছে স্বীকৃত ও বোধগম্য। বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ব্যাপারটা বর্তমানে কোন নির্দিষ্ট দেশে সীমাবদ্ধ থাকে না, বৈশ্বিক পরিসরে আমাদের চিন্তা করতে হয়।

বাংলাদেশে আমরা ভিন্ন ভিন্ন দৈর্ঘ্য মাপার ক্ষেত্রে গজ, মিটার, ফুট, ইঞ্চি এরকম পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করি, এর সবগুলোর মাপ নিয়ে আমাদের ধারণা আছে। কিন্তু অন্য অনেক সংস্কৃতিতে কিন্তু এই সবগুলো বোধগম্য হবে না। তো এই সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৬০ সালে আন্তর্জাতিকভাবে ৭টি মৌলিক একককে স্বীকৃতি দেয়া হয়। যাকে আমরা এককের আন্তর্জাতিক পদ্ধতি বা International System of Unit বা সংক্ষেপে SI পদ্ধতি বলি।

SI পদ্ধতিতে মৌলিক এককগুলো হলো-

রাশিএকক (Unit)
সময়সেকেন্ড
দৈর্ঘ্যমিটার
ভরকিলোগ্রাম
বিদ্যুৎ প্রবাহঅ্যাম্পিয়ার
তাপমাত্রাকেলভিন
পদার্থের পরিমাণমোল
আলোর ঔজ্জ্বল্যক্যান্ডেলা

এই এককগুলোকে ১০ গুণ বা ১০ ভাগ করে ছোট বা বড় এককে পরিণত করা যায়। যেমন মিটারকে ১০ ভাগ করলে ডেসিমিটার, আরো ১০ ভাগ করলে সেন্টিমিটার, আরো ১০ ভাগ করলে মিলিমিটার। একইভাবে ১০ করে গুণ করলে পর্যায়ক্রমে ডেকামিটার, হেক্টোমিটার ও কিলোমিটার পাবো আমরা। তো SI পদ্ধতিতে ছোট-বড় মাপের জন্য এরকম গুণিতক ও ভগ্নাংশগুলোর ব্যবহার করা যায়।

আবার যেহেতু যৌগিক এককগুলো এই এককগুলোর সমন্বয়েই তৈরি হয়, তাই সব যৌগিক একক আমরা এই সাতটা একক দিয়েই বানাতে পারবো। যেমন ক্ষেত্রফলের একক মিটার × মিটার, যেটাকে আমরা মিটার² বা বর্গ মিটার বলে থাকি।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এককের বাইরে আমরা বিভিন্ন দেশে বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্য বিভিন্ন পদ্ধতির প্রচলন দেখি। এরকম SI পদ্ধতির বাইরে এককের আরো কিছু পদ্ধতি হলো-

MKS পদ্ধতি: দৈর্ঘ্যের একক মিটার, ভরের একক কিলোগ্রাম, সময়ের একক সেকেন্ড
FPS পদ্ধতি: দৈর্ঘ্যের একক ফুট, ভরের একক পাউন্ড, সময়ের একক সেকেন্ড
CGS পদ্ধতি: দৈর্ঘ্যের একক সেন্টিমিটার, ভরের একক গ্রাম, সময়ের একক সেকেন্ড

এই পদ্ধতিগুলোতে শুধু তিনটি করে একক আছে। যেকারণে সব ধরণের রাশিকে কিন্তু এই পদ্ধতিগুলোতে প্রকাশ করা সম্ভব না।