জীবের শ্রেণিকরণের প্রয়োজনীয়তা

বিজ্ঞানে আমরা প্রকৃতিকে অধ্যয়নের চেষ্টা করি। আর এই প্রচেষ্টার একটা অংশ হলো প্যাটার্ন বা সাদৃশ্যতা খুঁজে বের করা। আণুবীক্ষণিক জীব বা প্রত্যন্ত কোন অঞ্চলে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কোন জীব এরকম নতুন নতুন জীবের সন্ধান আমরা ক্রমাগত পেয়ে থাকি। এজন্য সর্বমোট কত রকমের জীব আছে, এটা আমরা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারবো না। বিজ্ঞানীদের একটা অনুমান হলো পৃথিবীতে ৮৭ লক্ষ ধরণের জীব থাকতে পারে।

তো এখন জীবজগৎকে জানা কেন প্রয়োজন? আসলে কৌতুহল, অজানাকে জানার আগ্রহ তো মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। এর জন্য আলাদা কারণ প্রয়োজন হয় না। তবে জীবজগৎ নিয়ে জানার প্রায়োগিক বিভিন্ন দিকও আছে। যেমন, নতুন কোন ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগের উদ্ভব ঘটলো। আমরা যদি আমাদের পরিচিত ব্যাকটেরিয়াগুলোর সাথে এর সাদৃশ্যের জায়গাটা খুঁজে বের করতে পারি, তাহলে চিকিৎসা আবিষ্কারের দিকে আমরা কিন্তু অনেকটাই এগিয়ে যাবো। আবার নতুন কোন চিকিৎসা যখন আবিষ্কার হবে, তখন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা কার্যকারিতা নিশ্চিত না হয়ে কিন্তু আমরা মানুষের ওপর সেটা প্রয়োগ করতে পারবো না। তার জন্য আমরা হয়ত শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে মানুষের কাছাকাছি কোন জীবের ওপর সেটা আগে প্রয়োগ করে দেখবো।

তো জীবের শ্রেণিকরণ কেন প্রয়োজন, এই প্রশ্নের উত্তরটা হয়ত এই পর্যায়ে আলাদাভাবে দেয়ার আর প্রয়োজন নেই। এই সুবিশাল জীবজগৎকে জানার জন্য সাদৃশ্যতার ভিত্তিতে শ্রেণিভুক্ত করা আমাদের জন্য জীবজগৎ সম্পর্কে জানা ও সেই জ্ঞানকে কাজে লাগানোকে সহজ ও সম্ভব করে তোলে।

জীবের শ্রেণিকরণ

উদ্ভিদ ও প্রাণী- এই দুটো শ্রেণিতে তো আমরা সহজেই জীবজগৎকে ভাগ করতে পারি। কিন্তু সম্পূর্ণ জীবজগৎকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এটা যথেষ্ট না। যেমন- ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাক, এরা কিন্তু উদ্ভিদ বা প্রাণী কোনটার মধ্যেই রাখা যায় না। তো ১৯৬৯ সালে বিজ্ঞানী হুইটেকার পঞ্চরাজ্য শ্রেণিবিন্যাস অর্থাৎ পাঁচ রাজ্যে জীবজগৎকে বিন্যাস করেন। পরে ১৯৭৪ সালে বিজ্ঞানী মারগুলিস দুটি অধিরাজ্যের অধীনে পাঁচ রাজ্যকে পুনর্বিন্যস্ত করেন, যা জীবজগতের আধুনিক শ্রেণিবিন্যাস হিসেবে পরিচিত।

জীবজগৎ

  • আদিকোষী জীব
    • রাজ্য ১: মনেরা
  • প্রকৃতকোষী জীব
    • রাজ্য ২: প্রোটিস্টা
    • রাজ্য ৩: ফানজাই
    • রাজ্য ৪: প্লান্টি
    • রাজ্য ৫: অ্যানিমেলিয়া

একটা বিল্ডিং অনেকগুলো ইট দিয়ে তৈরি হয়, আমরা সেই হিসেবে ইটকে বলতে পারি বিল্ডিংয়ের গাঠনিক একক। প্রত্যেকটা জীবও এরকম এক ধরণের গঠন ও কাজের একক আছে, যাকে বলা হয় কোষ। আদিকোষ ও প্রকৃতকোষ জীবকোষের দুটো ধরণ। কোষের নিউক্লিয়াস সুগঠিত কিনা, তার ওপর ভিত্তি করে এই বিভাজন করা। কিছু জীব এককোষী, আবার কিছু জীব অসংখ্য কোষ নিয়ে গঠিত। কোষ নিয়ে আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে আরো জানবো।

রাজ্যগুলোর বৈশিষ্ট্য

রাজ্য ১: মনেরা
  • আদিকোষী, অর্থাৎ কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না
  • এককোষী, অর্থাৎ প্রতিটি জীবে একটিমাত্র কোষ থাকে
  • আণুবীক্ষণিক, অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া খালি চোখে দেখা যায় না
  • উদাহরণ: ব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি
রাজ্য ২: প্রোটিস্টা
  • প্রকৃতকোষী, অর্থাৎ কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে
  • এককোষী বা বহুকোষী হতে পারে
  • একক বা দলবদ্ধভাবে থাকতে পারে
  • অনেক প্রোটিস্টা ক্লোরোফিলযুক্ত, যারা নিজের খাবার তৈরি করতে পারে
  • উদাহরণ: ইউগ্লেনা, অ্যামিবা ইত্যাদি
রাজ্য ৩: ফানজাই (ছত্রাক)
  • প্রকৃতকোষী, অর্থাৎ সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত
  • এককোষী বা বহুকোষী হতে পারে
  • দেহে ক্লোরোফিল নেই, তাই এরা পরভোজী
  • কাইটিন নির্মিত কোষপ্রাচীর থাকে
  • উদাহরণ: ইস্ট, পেনিসিলিয়াম, মাশরুম ইত্যাদি
রাজ্য ৪: প্লান্টি (উদ্ভিদজগৎ)
  • প্রকৃতকোষী, অর্থাৎ সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত
  • বহুকোষী, অসংখ্য কোষ দিয়ে গঠিত
  • অধিকাংশ উদ্ভিদ সবুজ কণিকা বা ক্লোরোফিল ব্যবহার করে নিজের খাদ্য তৈরি করতে পারে
  • কোষে কোষগহ্বর থাকে
  • সেলুলোজ নির্মিত কোষপ্রাচীর থাকে
  • উদাহরণ: মস, ফার্ন, আমগাছ ইত্যাদি
রাজ্য ৫: অ্যানিমেলিয়া (প্রাণিজগৎ)
  • প্রকৃতকোষী, বহুকোষী
  • সেলুলোজ নির্মিত কোষপ্রাচীর থাকে না
  • সাধারণত প্লাস্টিড ও ক্লোরোফিল অনুপস্থিত থাকায় খাদ্যের জন্য অন্য জীবের ওপর নির্ভরশীল
  • উদাহরণ: মাছ, পাখি, মানুষ ইত্যাদি