শ্রেণিবিন্যাস ও এর প্রয়োজনীয়তা
আমাদের প্রথম অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে প্রাণিজগতের শ্রেণিবিন্যাস থেকে। আমরা শুরু করার আগে একটু সংক্ষেপে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে আমরা জীবজগৎ ও শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে যেটুকু পড়েছিলাম, আরেকবার মনে করে নিই।
আমরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে জেনেছি কিছু বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আমরা জড় পদার্থ ও জীবের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি। যেমন- বৃদ্ধি, পুষ্টি লাভ, প্রজনন, পরিবেশের প্রতি প্রতিক্রিয়া এরকম কিছু বৈশিষ্ট্য একসাথে থাকলে আমরা জীব হিসেবে চিহ্নিত করি।
জীবের মধ্যেও আবার অনেক রকমফের আছে। আমরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পাঁচটি রাজ্যে জীবজগৎকে ভাগ করেছিলাম- মনেরা, প্রোটিস্টা, ফানজাই, প্লানটি ও অ্যানিমেলিয়া। উদ্ভিদগুলো এখানে প্লানটি রাজ্যের মধ্যে রাখা হয়েছে, এবং প্রাণীদেরকে অ্যানিমেলিয়া রাজ্যে। প্রথমদিকের রাজ্যেগুলোতে আমরা তুলনামূলক সরল গঠনের জীবগুলোকে রেখেছি- যাদেরকে আমরা অনুন্নত বা নিম্নশ্রেণির জীব হিসেবে চিহ্নিত করি।
আমরা উদ্ভিদজগতের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েছি, প্রাণিজগতের শ্রেণিবিন্যাস সংক্ষেপে কিছুটা জেনেছি। সপ্তম শ্রেণিতে আমরা পড়েছি নিম্নশ্রেণির জীবগুলো নিয়ে। অষ্টম শ্রেণিতে আমরা প্রাণিজগতের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত পড়বো। সেইসাথে শ্রেণিবিন্যাস কীভাবে করা হয় তা নিয়েও আরেকটু জানার চেষ্টা করব।
শ্রেণিবিন্যাস (Taxonomy)
সহজে সুশৃঙ্খলভাবে জীবজগতকে জানার জন্য একে বিন্যস্ত করার প্রচেষ্টা-ই হলো শ্রেণিবিন্যাস।
শ্রেণিবিন্যাসের ধাপ
পাঁচটা রাজ্য আমাদেরকে খুব মোটাদাগে জীবজগতের একটা বিভাজন করে দিচ্ছে বটে, কিন্তু এই একেকটা রাজ্যের মধ্যেও বৈচিত্র কম না। চিন্তা কর, বাঘ আর চিংড়ি মাছ, দুটোই প্রাণীজগতের মধ্যে পড়ে, কিন্তু কতটা পার্থক্য। আবার চিংড়ি আর কাঁকড়া কিংবা বাঘ আর সিংহ- এদের মধ্যে কিন্তু তুলনামূলক বেশ মিল আছে।
তাহলে আমরা প্রত্যেকটা রাজ্যকে আরো ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রধানত সাতটি ধাপে আমরা জীবজগৎকে শ্রেণিবিন্যাস করি। যেমন-
- Kingdom (রাজ্য বা জগৎ)
- Phylum (পর্ব)
- Class (শ্রেণি)
- Order (বর্গ)
- Family (গোত্র)
- Genus (গণ)
- Species (প্রজাতি)
এভাবে ধাপে ধাপে শ্রেণিবিন্যাসের সুবিধা হলো ওপরের দিকের ধাপগুলোতে আমরা খুব দ্রুত মোটাদাগে সম্যক ধারণা পেতে পারি, আর নিচের দিকের ধাপগুলোতে সূক্ষ্মতর বৈশিষ্ট্যগুলো আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে পারি। প্রয়োজনমত ক্ষেত্রবিশেষে আমরা আরো ধাপ নিয়ে আসি, যেমন প্রাণিজগতের শ্রেণিবিন্যাসে আমরা দেখবো কর্ডাটা পর্বকে তিনটি উপপর্বে ভাগ করে উপপর্বগুলোর অধীনে বিভিন্ন শ্রেণি রাখা হয়।
প্রজাতির ধারণা
প্রজাতি: সাধারণভাবে যে জীবগুলো নিজেদের মধ্যে প্রজননের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধির ধারা চালু রাখতে পারে, তাদের নিয়ে একটি প্রজাতি তৈরি হয়
শ্রেণিবিন্যাসের আল্টিমেট উদ্দেশ্য হলো প্রত্যেকটা প্রজাতিকে আলাদা আলাদাভাবে জানা। প্রজাতির সদস্যদের মধ্যেও ভিন্নতা থাকে। আমার আর তোমার মধ্যে পার্থক্য তো আছে, কিন্তু এই পার্থক্যের পরও দিনশেষে আমরা দুজনই যে মানুষ- এই পর্যন্ত চিহ্নিত করা শ্রেণিবিন্যাসের উদ্দেশ্য।
দ্বিপদ নামকরণ ও ক্যারোলাস লিনিয়াস
খ্রিস্টপূর্ব সময়ে গ্রিক সভ্যতায় অ্যারিস্টটল সর্বপ্রথম নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রাণীজগৎকে রক্তের উপস্থিতির ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস করেন। সপ্তদশ শতকে জন রে প্রথম প্রজাতির সংজ্ঞা দেন।
শ্রেণিবিন্যাসের ইতিহাসে সুইডিশ বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াসের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি ধাপে ধাপে শ্রেণিবিন্যাসের ধারণা প্রথম নিয়ে আসেন। প্রত্যেকটা প্রজাতির জন্য গণ ও প্রজাতির সমন্বয়ে দ্বিপদ নামকরণের প্রচলন করেন। একে বৈজ্ঞানিক নামকরণও বলা হয়। যেমন মানুষের গণ হলো Homo এবং প্রজাতি হলো sapiens, এজন্য মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম Homo sapiens।
ক্যারোলাস লিনিয়াসকে শ্রেণিবিন্যাসের জনক বলা হয়।
দ্বিপদ নামকরণ বা বৈজ্ঞানিক নামকরণ: গণ এবং প্রজাতি নামের সমন্বয়ে প্রত্যেকটি প্রজাতির জন্য দুই অংশ বা দুই পদ বিশিষ্ট নামকরণকে দ্বিপদ নামকরণ বলে।
দ্বিপদ নামকরণের কয়েকটি নিয়ম
-> দ্বিপদ নামকরণ ল্যাটিন ভাষায় হয় -> গণ এবং প্রজাতি দুটি অংশ থাকে -> গণ অংশের প্রথম অক্ষর বড় হাতের হয়, প্রজাতি অংশের প্রথম অক্ষর ছোট হাতের হয় -> ইটালিক অক্ষরে লিখতে হয় (Homo sapiens) অথবা দুই অংশকে আলাদাভাবে আন্ডারলাইন করতে হয় (Homo sapiens)
শ্রেণিবিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা
জানার ইচ্ছা বা কৌতুহল মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। আবার যখন আমরা জানি, তখন সে জ্ঞানকে কাজে লাগানোরও সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু প্রত্যেকটা জীব প্রজাতি সম্পর্কে আলাদা আলাদাভাবে জানা আমাদের সংক্ষিপ্ত জীবনে সম্ভব না। যখন আমরা সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোর ভিত্তিতে শ্রেণিকরণ করি, তখন আমরা সামগ্রিকভাবে প্রত্যেক ধরণের জীব সম্পর্কে জানার সুযোগ পাই।
শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে-
- মিল-অমিলের ভিত্তিতে জীবদের পরস্পরের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপন করা যায়
- বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে জীবজগৎ সম্পর্কে পরিকল্পিতভাবে সামগ্রিক জ্ঞান লাভ করা সহজ ও সম্ভবপর হয়
- লক্ষ লক্ষ প্রজাতির জীবকে পৃথকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়, নতুন প্রজাতি শনাক্ত করতে শ্রেণিবিন্যাস অপরিহার্য
- জীবের মধ্যে ঘটে চলা পরিবর্তন সম্পর্কে জানা যায়
জীবজগৎ সম্পর্কে জ্ঞান বিভিন্নভাবে আমাদের কাজে লাগতে পারে। যেমন কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, চিকিৎসাবিদ্যায় রোগ সৃষ্টিকারী জীব শনাক্তকরণ, জীববৈচিত্র ও পরিবেশ সংরক্ষণ প্রভৃতি।