প্রাণীজগতের পর্বগুলোর বৈশিষ্ট্য
আমরা জীবজগতের শ্রেণিবিন্যাসে সবসময়ই একটি বিষয় দেখবো, আমরা ক্রমাগত সরল গঠন ও বৈশিষ্ট্য থেকে জটিল বৈশিষ্ট্যের দিকে যায় এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করি। প্রাণীজগতের মধ্যে সরলতম বা সবচেয়ে অনুন্নত হলো পরিফেরা এবং জটিলতম বা সবচেয়ে উন্নত হলো কর্ডাটা।
মানুষের কথা যদি আমরা চিন্তা করি, আমাদের মাংসপেশী আছে, হাত-পা বিভিন্ন অঙ্গ আছে, পৌষ্টিকতন্ত্র, রেচনতন্ত্র বিভিন্ন তন্ত্র আছে। অর্থাৎ বিভিন্ন কোষ সমন্বিতভাবে কাজ করে টিস্যু, অঙ্গ, তন্ত্র প্রভৃতি গঠন করছে। একদম সরল প্রাণীগুলোর কোষগুলোর মধ্যে এরকম সমন্বয় দেখা যায় না। এরকম ভ্রুণীয় কোষস্তর, দেহগহ্বর, প্রজননের ধরণ প্রভৃতি জায়গাতে আমরা পর্বগুলোর মধ্যে উন্নত বৈশিষ্ট্যের দিকে যেতে দেখবো।
১. পরিফেরা
- অর্থ: ছিদ্রাল প্রাণী
- সাধারণভাবে স্পঞ্জ নামে পরিচিত
- উদাহরণ: Spongilla, Scypha
স্বভাব ও বাসস্থান
- অধিকাংশ প্রজাতি সামুদ্রিক, কিছু মিঠাপানির
- সাধারণত দলবদ্ধ
- সবরকম অঞ্চলে দেখা যায়
সাধারণ বৈশিষ্ট্য
- সরলতম বহুকোষী প্রাণী
- দেহপ্রাচীর অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত, ছিদ্রপথে পানি ও খাবার প্রবেশ করে
- কোন পৃথক সুগঠিত কলা, অঙ্গ ও তন্ত্র থাকে না
২. নিডারিয়া
- নিডোসাইট (Cnidocyte) নামক কোষের উপস্থিতির কারণে নামকরণ
- পূর্বে সিলেন্টারেটা নামে পরিচিত ছিলো
- উদাহরণ: Hydra, Obelia
স্বভাব ও বাসস্থান
- অধিকাংশ প্রজাতি সামুদ্রিক, কিছু মিঠাপানির
- বিচিত্র বর্ণ ও আকৃতির হয়
- একক বা দলবদ্ধভাবে কলোনি গঠন করে
- সবরকম অঞ্চলে দেখা যায়
সাধারণ বৈশিষ্ট্য
- দুটি ভ্রূণীয় কোষস্তর (বাইরের স্তর এক্টোডার্ম, ভেতরের স্তর এন্ডোডার্ম)
- দেহগহ্বরকে সিলেন্টেরন বলে, যা একইসাথে পরিপাক ও সংবহনে অংশ নেয়
- এক্টোডার্মে নিডোব্লাস্ট নামক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কোষ আছে, যা শিকার ধরা, আত্মরক্ষা, চলন প্রভৃতি কাজে অংশ নেয়।
খেয়াল কর, পরিফেরা পর্বের প্রাণীরা বহুকোষী হলেও ছিলো একদমই সরল গঠনের। নিডারিয়া পর্বে এসে আমরা দুটি ভ্রুণীয় কোষস্তর, দেহগহ্বরের উপস্থিতি এবং শিকার, আত্মরক্ষা, চলনের মত বৈশিষ্ট্য দেখতে পাচ্ছি।
ভ্রুণীয় কোষস্তর: ভ্রুণ পর্যায়ে কোষের যে স্তরগুলো পরবর্তীতে টিস্যু বা অঙ্গ সৃষ্টি করে।
৩. প্লাটিহেলমিনথেস
- অর্থ: চ্যাপ্টা কৃমি
- উদাহরণ: যকৃত কৃমি (Fasciola), ফিতা কৃমি (Taenia)
স্বভাব ও বাসস্থান
- সাধারণতি বহিঃপরজীবী বা অন্তঃপরজীবী (অন্য জীবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে দেহের বাইরে বা ভেতরে বাস করে)
- কিছু প্রজাতি মুক্তজীবী হিসেবে লবণাক্ত বা মিঠাপানি বা ভেঁজা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে বাস
সাধারণ বৈশিষ্ট্য
- দেহ চ্যাপ্টা, উভলিঙ্গ
- দেহ পুরু কিউটিকলে আবৃত
- শিখা অঙ্গ নামক রেচন অঙ্গ উপস্থিত
- পৌষ্টিকতন্ত্র অসম্পূর্ণ বা অনুপস্থিত
প্লাটিহেলমিনথেস থেকে পরবর্তী পর্বগুলোর প্রাণীদেরূ ভ্রণস্তর ত্রিস্তরী হয় এবং সেখান থেকে অঙ্গের উদ্ভব ঘটে। আমরা প্লাটিহেলমিনথেসে প্রথমবারের মত কোন অঙ্গের উপস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। তবে পূর্ণাঙ্গ কোন তন্ত্র উপস্থিত নেই।
৪. নেমাটোডা
- নেমাথেলমিনথিস নামেও পরিচিত, অর্থ: সুতা কৃমি
- উদাহরণ: গোলকৃমি, ফাইলেরিয়া কৃমি
স্বভাব ও বাসস্থান
- সাধারণতি বহিঃপরজীবী বা অন্তঃপরজীবী (অন্য জীবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে দেহের বাইরে বা ভেতরে বাস করে)
- কিছু প্রজাতি মুক্তজীবী হিসেবে লবণাক্ত বা মিঠাপানি বা ভেঁজা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে বাস
সাধারণ বৈশিষ্ট্য
- দেহ নলাকার ও পুরু ত্বক দ্বারা আবৃত
- পৌষ্টিকনালী সম্পূর্ণ, মুখ ও পায়ুছিদ্র উপস্থিত
- শ্বসনতন্ত্র ও সংবহনতন্ত্র অনুপস্থিত
- সাধারণত একলিঙ্গ
- দেহ গহ্বর অনাবৃত, প্রকৃত সিলোম নেই (ভ্রান্তসিলোম)
সিলোম: বহুকোষী প্রাণীর পৌষ্টিকতন্ত্র ও দেহপ্রাচীরের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানকে সিলোম বলে।
সিলোম মূলত ত্রিস্তরী প্রাণীদের ক্ষেত্রে মাঝের ভ্রুণস্তর (মেসোডার্ম) থেকে তৈরি হওয়া গহ্বর। নেমাটোডাদের দেহগহ্বর থাকলেও তা মাঝের স্তর থেকে তৈরি না হয়ে মাঝের আর বাইরের স্তরের মধ্যে থাকে। যেকারণে একে ভ্রান্তসিলোম বলা হয়।
৫. অ্যানিলিডা
- Annulus অর্থ ছোট আংটি, সেখান থেকে অ্যানিলিডা শব্দ এসেছে
- উদাহরণ: কেঁচো, জোঁক
স্বভাব ও বাসস্থান
- স্বাদু পানি/অগভীর সমুদ্র/সেঁতসেঁতে মাটি/পাথর বা মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বসবাস করে
- নাতিশীতোষ্ণ ও ঊষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলে পাওয়া যায়
সাধারণ বৈশিষ্ট্য
- দেহ নলাকার ও খন্ডায়িত
- নেফ্রিডিয়া নামক রেচন অঙ্গ উপস্থিত
- চলনের জন্য প্রতি খন্ডে সিটা থাকে (ব্যতিক্রম: জোঁকে থাকে না)
৬. আর্থ্রোপোডা
- অর্থ: সন্ধিযুক্ত পা
- প্রাণীজগতের সর্ববৃহৎ পর্ব
- উদাহরণ: প্রজাপতি, চিংড়ি, আরশোলা, মশা, মাকড়সা
স্বভাব ও বাসস্থান
- সবরকম অঞ্চলে পাওয়া যায়
- কিছু প্রজাতি বহিঃপরজীবী ও অন্তঃপরজীবী
- কিছু প্রজাতি স্থল/স্বাদু পানি/সমুদ্রে বাস করে
- অনেক প্রাণী উড়তে পারে
সাধারণ বৈশিষ্ট্য
- দেহ বিভিন্ন অংশে ভাগ করা যায়, পতঙ্গদের ক্ষেত্রে মস্তক, বক্ষ ও উদর তিনটি অংশে বিভক্ত
- সন্ধিযুক্ত উপাঙ্গ বিদ্যমান
- মাথায় একজোড়া পুঞ্জাক্ষি ও এন্টেনা থাকে
- দেহ কাইটিন সমৃদ্ধ শক্ত আবরণে আবৃত
- দেহের হিমোসিল নামক রক্তপূর্ণ গহ্বর থাকে
প্রজাতির সংখ্যায়, সদস্য সংখ্যায়, বা সর্বত্র বিচরণে- সব দিক থেকেই এরা সবচেয়ে বৃহত্তম পর্ব। পতঙ্গ, ক্রাস্টাসীয় (চিংড়ি, কাঁকড়া) প্রভৃতি প্রাণীরা স্থান পেয়েছে এই পর্বে।
৭. মলাস্কা
- অর্থ: নরম
- উদাহরণ: শামুক, ঝিনুক
স্বভাব ও বাসস্থান
- সবরকম অঞ্চলে পাওয়া যায়
- প্রায় সবাই সামুদ্রিক
- কিছু প্রজাতি পাহাড়ি অঞ্চল, বনজঙ্গল ও স্বাদু পানিতে বাস করে।
সাধারণ বৈশিষ্ট্য
- দেহ নরম
- নরম দেহ ম্যান্টল নামক শক্ত খোলকে আবৃত
- পেশিবহুল পা দ্বারা চলাচল করে
- ফুসফুস বা ফুলকার সাহায্যে শ্বসনকার্য চালায়
৮. একাইনোডারমাটা
- অর্থ: কাঁটাযুক্ত ত্বক
- উদাহরণ: তারামাছ, সমুদ্র শসা
স্বভাব ও বাসস্থান
- এই পর্বের সকল প্রাণী সামুদ্রিক
- সকল মহাসাগরে এবং সকল গভীরতায় বসবাস করে
- অধিকাংশ মুক্তজীবী
সাধারণ বৈশিষ্ট্য
- দেহ কাঁটাযুক্ত
- সাধারণত পাঁচটি সমান ভাগে বিভক্ত (পঞ্চঅরীয় প্রতিসম)
- পানি সংবহনতন্ত্র বিদ্যমান এবং নালিপদের সাহায্যে চলাচল করে
- পূর্ণাঙ্গ প্রাণীতে অঙ্কীয় ও পৃষ্ঠদেশ নির্ণয় করা যায় কিন্তু মাথা নির্ণয় করা যায় না
প্রতিসাম্যতা: দেহের কোন তলের সাপেক্ষে উভয়দিকে সদৃশ অংশের অবস্থান। যেমন: গোলীয় প্রতিসাম্য, অরীয় প্রতিসাম্য, দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসাম্য।
যেমন, মানুষের নাক বরাবর লম্বালম্বি তল চিন্তা করলে তার ডান-বাম উভয়দিক সদৃশ। এজন্য মানুষ দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম। তারামাছসহ বিভিন্ন একাইনোডারমাটাদের কেন্দ্রীয় অক্ষ বরাবর পাঁচটি তলে অর্ধাংশে ভাগ করা যায়। এজন্য এদের পঞ্চঅরীয় প্রতিসম বলে।
৯. কর্ডাটা
- Chorda শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ রজ্জু বা নালি
- উদাহরণ: মানুষ, কুনোব্যাঙ, তিমি মাছ
স্বভাব ও বাসস্থান
- সকল পরিবেশে বাস করে
- অনেক প্রাণী বহিঃপরজীবী হিসেবে অন্য প্রাণীর দেহ সংলগ্ন জীবনযাপন করে
সাধারণ বৈশিষ্ট্য
- সারা জীবন অথবা ভ্রূণ অবস্থায় পৃষ্ঠীয়দেশ বরাবর নটোকর্ড বহন করে
- পৃষ্ঠদেশে একক, ফাঁপা স্নায়ুরজ্জু থাকে
- সারা জীবন অথবা জীবন চক্রের কোন পর্যায়ে পার্শ্বীয় গলবিলীয় ফুলকা ছিদ্র থাকে (মানুষের ক্ষেত্রে ভ্রুণ অবস্থায়)
নটোকর্ড: একটি নরম, নমনীয়, দন্ডাকার, দৃঢ় ও অখন্ডায়িত অঙ্গ যা কর্ডাটা পর্বের প্রাণীদের থাকে। মেরুদন্ডী প্রাণীদের ক্ষেত্রে নটোকর্ড পরবর্তীতে মেরুদন্ডে রূপান্তরিত হয়।