আদিকোষ ও প্রকৃত কোষ

সকল জীবদেহ কোষ দিয়ে গঠিত। কিছু জীব একটা মাত্র কোষ দিয়ে তৈরি, আবার কিছু জীব একাধিক বা অসংখ্য কোষ দিয়ে তৈরি। জীবনের লক্ষণগুলো, যেমন-বৃদ্ধি, বিকাশ, পুষ্টি লাভ, শক্তির রূপান্তর, উদ্দীপনায় সাড়া দেয়া প্রভৃতি কোষের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

আমরা যে দেখি বাবা-মায়ের সাথে সন্তানদের বিভিন্ন মিল থাকে- এরকম বংশগতির বৈশিষ্ট্যগুলো পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারণের মূল ভূমিকা রাখে কোষের নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রিকা। উন্নত জীবদের ক্ষেত্রে নিউক্লিয়াস আবরণীতে ঘেরা থাকে। তবে নিম্নশ্রেণির কিছু জীবে এরকম আবরণীতে ঘেরা নিউক্লিয়াস থাকে না, তার বদলে বংশগতির কিছু উপাদান কোষের মধ্যে ছড়ানো থাকে।

নিউক্লিয়াসের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে জীবকোষ ২ প্রকার:

১. আদিকোষ: কোষে আবরণীতে আবদ্ধ নিউক্লিয়াস থাকে না। যেমন- ব্যাকটেরিয়া
২. প্রকৃত কোষ: কোষে আবরণীতে আবদ্ধ নিউক্লিয়াস থাকে।

প্রোক্যারিওটা সুপার কিংডমে আদিকোষী জীবদের রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ইউক্যারিওটা সুপার কিংডমে রাখা হয়েছে প্রকৃতকোষী জীবদের।

গ্রিক শব্দ ক্যারিওন মূলত নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রিকা অর্থ প্রকাশ করে। তো শাব্দিক অর্থেই প্রোক্যারিওটা হলো আদি নিউক্লিয়াসযুক্ত, আর ইউক্যারিওটা সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত।

তুলনামূলকভাবে আদিকোষের গঠন খুব সরল ধরণের। নিউক্লিয়াসের পাশাপাশি আবরণীতে আবদ্ধ কোন অঙ্গাণুই আসলে থাকে না। তবে এই সরল গঠন নিয়েই জীবনের মৌলিক লক্ষণগুলো এরা পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে।

জীবের শ্রেণিবিন্যাস

বিজ্ঞানে এক দিক থেকে আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে তত্ত্ব উপস্থাপন করি, অন্যদিকে একটা তত্ত্বের যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা থাকলে তার ওপর ভিত্তি করে আমাদের পর্যবেক্ষণগুলো উপস্থাপন করি। শ্রেণিবিন্যাসের বিভাজন কিন্তু প্রকৃতিতে সরাসরি করা থাকে না। আমাদের অধ্যয়নের সুবিধার্থে আমরা ভাগ করে নিই। একারণে আমরা যে ফ্রেমওয়ার্কের ভিত্তিতে কাজ করছি, সে জায়গাটার ধারণা থাকাটা প্রয়োজন।

আধুনিক জীববিজ্ঞান বড় অংশে গড়ে উঠেছে বিবর্তনের ধারণার ওপর। জীবের শ্রেণিবিন্যাসও তাই। প্রজাতির উদ্ভবের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক অবস্থান মোটামুটি এরকম যে প্রথমে সরলতম জীবদের উদ্ভব ঘটেছে, সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আরো জটিলতর প্রাণের দিকে গিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও, মৌলিক এই ধারণাটুকু অনেকাংশে আধুনিক জীববিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে আমরা দেখবো আমরা প্রথমে সবচেয়ে সরল গঠন-বৈশিষ্ট্যের জীবদেরকে রাখছি এবং ক্রমান্বয়ে জটিল জীবদের দিকে যাচ্ছি। আমরা সরল জীবদেরকে অনুন্নত এবং জটিল জীবদের উন্নত হিসেবে বিবেচনা করি। এভাবে উপস্থাপনার বিষয়গুলো বিবর্তনের ধারণা থেকেই এসেছে।

অনুন্নত জীবদের বেলায় আমরা দেখবো কোষ আদিকোষ ধরণের। অথবা প্রকৃতকোষ হলেও হয়ত এককোষী, কিংবা বহুকোষী হলেও কোষগুলোর মধ্যে জটিল সমন্বয় নেই। অন্যদিকে উন্নত জীবদের বেলায় দেহের গঠন-বৈশিষ্ট্য জটিল হবে, কোষগুলো বিভিন্ন অঙ্গ-তন্ত্র প্রভৃতি জটিল কাঠামো ও তাদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলবে।

সুপার কিংডম 1: প্রোক্যারিওটা

  • আদিকোষবিশিষ্ট (নিউক্লিয়াস সুগঠিত না) জীবদের নিয়ে গঠিত সুপার কিংডম
  • এককোষী ও আণুবীক্ষণিক
  • শুধুমাত্র মনেরা রাজ্য এই সুপার কিংডমের অধীনে
রাজ্য 1: মনেরা (Monera)
  • এককোষী এবং কোষটি আদিকোষ প্রকৃতির
  • কলোনিয়াল (দলবদ্ধ) অথবা ফিলামেন্টাস (একটির পর আরেকটি জীব লম্বালম্বিভাবে যুক্ত থাকে)
  • নিউক্লিয়াস আবরণীতে ঘেরা না- নিউক্লিয়ার পর্দা ও নিউক্লিওলাস নেই। ক্রোমাটিন বস্তু কোষে ছড়ানো থাকে।
  • আবরণী ঘেরা কোন অঙ্গাণু যেমন- প্লাস্টিড, মাইটোকন্ড্রিয়া, এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা ইত্যাদি নেই।
  • আবরণীবিহীন অঙ্গাণুর মধ্যে রাইবোজোম আছে।
  • কোষ বিভাজন দ্বিবিভাজন প্রক্রিয়ায় ঘটে, কোষ বিভাজনের ফলে একটি থেকে নতুন দুটি জীব সৃষ্টি হয়
  • প্রধানত শোষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্যগ্রহণ করে
  • কেউ কেউ সালোকসংশ্লেষণ (ফটোসিনথেসিস) প্রক্রিয়ায় খাদ্যগ্রহণ করে
  • উদাহরণ- ব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া (নীলাভ সবুজ শৈবাল), আর্কিয়া

সায়ানোব্যাকটেরিয়াকে নীলাভ সবুজ শৈবাল (blue green algae) বলা হলেও এরা আসলে এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া। তবে ক্লোরোফিল থাকাতে এদের বর্ণ সবুজ এবং এরা সালোকসংশ্লেষণেও সক্ষম।

সুপার কিংডম 2: ইউক্যারিওটা

  • প্রকৃতকোষ বা সুগঠিত নিউক্লিয়াসবিশিষ্ট জীবদের নিয়ে গঠিত
  • এককোষী বা বহুকোষী হতে পারে
  • প্রোটিস্টা, ফানজাই, প্লানটি ও অ্যানিমেলিয়া রাজ্য এই সুপার কিংডমের অধীনে
রাজ্য 2: প্রোটিস্টা (Protista)
  • এককোষী অথবা বহুকোষী
  • সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত- ক্রোমাটিন বস্তু নিউক্লিয়ার পর্দা দ্বারা ঘেরা থাকে। ক্রোমাটিন বস্তুতে DNA, RNA এবং প্রোটিন থাকে।
  • একক অথবা কলোনিয়াল অথবা ফিলামেন্টাস
  • আবরণী ঘেরা এবং আবরণীবিহীন উভয় ধরণের অঙ্গাণু উপস্থিত
  • খাদ্যগ্রহণ শোষণ অথবা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াতে ঘটে
  • মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় অযৌন প্রজনন, কনজুগেশন প্রক্রিয়ায় যৌন প্রজনন ঘটে- কোন ভ্রুণ গঠিত হয় না
  • উদাহরণ- ব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া (নীলাভ সবুজ শৈবাল), আর্কিয়া

মাইটোসিস কোষ বিভাজন আমরা সামনে বিস্তারিত পড়ব। কনজুগেশন বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে, মানুষ বা উন্নত জীবদের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী এই দুটো ভাগ যেমন করা যায়, প্রোটিস্টাসহ বিভিন্ন নিম্নশ্রেণির জীবদের ক্ষেত্রে তেমনটা না। এদের যৌন মিলনের ক্ষেত্রে যে দুটো গ্যামেট (জননকোষ- যৌন প্রজননে অংশ নেয়া কোষ) মিলিত হবে, তারা গঠনগতভাবে পরস্পরের অনুরূপ। কনজুগেশন হলো এরকম জৈবনিকভাবে পৃথক সত্তা, কিন্তু গঠনগতভাবে এক- এমন দুটো গ্যামেটের মিলনের মাধ্যমে যৌন প্রজননের প্রক্রিয়া।

রাজ্য 3: ফানজাই (Fungi বা ছত্রাক)
  • এককোষী অথবা বহুকোষী, সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত
  • বহুকোষী ছত্রাকেরা মাইসেলিয়াম দিয়ে গঠিত (মাইসেলিয়াম- সরু সুতার মত গঠন)
  • কোষপ্রাচীর কাইটিন বস্তু দিয়ে তৈরি
  • ক্লোরোপ্লাস্ট নেই, খাদ্যগ্রহণ শোষণ পদ্ধতিতে ঘটে
  • মিয়োসিস কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় হ্যাপ্লয়েড স্পোর দিয়ে বংশবৃদ্ধি ঘটে (ভ্রুণ গঠিত হয় না)
  • উদাহরণ- ব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া (নীলাভ সবুজ শৈবাল), আর্কিয়া
রাজ্য 4: প্লানটি (Plantae)
  • বহুকোষী, সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত
  • সেলুলোজনির্মিত কোষপ্রাচীরবিশিষ্ট
  • সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরি করে
  • দেহকে বিভিন্ন অংশে (মূল, কান্ড, পাতা, ফুল, ফল) ভাগ করা যায়, টিস্যু ও তন্ত্র বিদ্যমান
  • স্থলজ ও জলজ প্রজাতি আছে
  • যৌন জনন অ্যানাইসোগ্যামাস প্রকৃতির
  • ভ্রুণ সৃষ্টি হয় এবং ভ্রুণ থেকে ডিপ্লয়েড পর্যায়ের সূচনা হয়

আইসো মানে অনুরূপ, অ্যানাইসো মানে অনুরূপ না। অ্যানাইসোগ্যামাস মানে জননকোষ অনুরূপ না। কনজুগেশনের ক্ষেত্রে গঠনগতভাবে জননকোষ দুটো একরকম ছিলো। অ্যানাইসোগ্যামাসের বেলায় আকার-আকৃতি অথবা শারীরবৃত্তীয় পার্থক্য থাকবে- অর্থাৎ একটি পুং জননকোষ, অন্যটি স্ত্রী জননকোষ মিলনের মাধ্যমে যৌন জনন সম্পন্ন হবে।

হ্যাপ্লয়েড ও ডিপ্লয়েড শব্দগুলো মিয়োসিস কোষ বিভাজনের আলোচনায় আমরা বিস্তারিত জানবো। আপাতত বলে রাখি হ্যাপ্লয়েড কোষে ক্রোমোজোমের সংখ্যা ডিপ্লয়েড কোষের অর্ধেক। উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহ ডিপ্লয়েড প্রকৃতির, তা মিয়োসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে হ্যাপ্লয়েড প্রকৃতির জননকোষ তৈরি হয়। দুটো হ্যাপ্লয়েড জননকোষের মিলনের পর সেখান থেকে ডিপ্লয়েড জাইগোট এবং সেখান থেকে ডিপ্লয়েড ভ্রুণ তৈরি হয়। অন্যদিকে ছত্রাকের দেহ হ্যাপ্লয়েড প্রকৃতির, জননকোষও হ্যাপ্লয়েড। দুটো হ্যাপ্লয়েড জননকোষ মিলিত হয়ে ডিপ্লয়েড জাইগোট তৈরি হয় এবং তা মিয়োসিস বিভাজিত হয়ে পুনরায় হ্যাপ্লয়েড কোষ তৈরি হয়।

রাজ্য 5: অ্যানিমেলিয়া (Animalia)
  • বহুকোষী, সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত
  • কোষে জড় কোষপ্রাচীর, প্লাস্টিড ও কোষগহ্বর নেই
  • প্লাস্টিড না থাকায় এরা হেটারোট্রফিক বা পরভোজী, খাদ্য গলাধঃকরণ করে
  • দেহে জটিল টিস্যুতন্ত্র বিদ্যমান, বিভিন্ন অঙ্গে ভাগ করা যায়
  • পুরুষ ও স্ত্রী জননাঙ্গ থেকে হ্যাপ্লয়েড গ্যামেট সৃষ্টি হয় এবং যৌন জননের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি ঘটে
  • ভ্রুণ বিকাশকালীন সময়ে ভ্রুণীয় স্তর সৃষ্টি হয়
  • উদাহরণ: প্রোটোজোয়া ব্যতীত সকল অমেরুদন্ডী ও মেরুদন্ডী প্রাণী

সালোকসংশ্লেষণের জন্য ক্লোরোফিল দরকার, যা ক্লোরোপ্লাস্ট প্রকৃতির প্লাস্টিডে অথবা আদিকোষী কিছু জীবের সাইটোপ্লাজমে থাকে। আমরা বলি উদ্ভিদ নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে- এর অর্থ উদ্ভিদ অন্য কোন জীবের ওপর খাদ্যের জন্য নির্ভরশীল না, সূর্যালোক ও জড় পদার্থ থেকে গ্লুকোজজাতীয় খাদ্য উৎপাদন করতে পারে। প্রাণীরা প্রত্যক্ষভাবে উদ্ভিদকে ভক্ষণ করে বা উদ্ভিদ থেকে পুষ্টি উপাদান শোষণ করে, অথবা উদ্ভিদ ভক্ষণকারী অন্য কোন প্রাণীকে ভক্ষণ করে।

প্রোটোজোয়া: proto অর্থ প্রাচীন বা প্রথম, zoa অর্থ প্রাণী। আক্ষরিক অর্থেই আদিমতম প্রাণী হিসেবে প্রোটোজোয়াদের চিন্তা করা হত। তবে বর্তমান জ্ঞানের আলোকে প্রোটোজোয়াকে সাধারণত প্রাণী হিসেবে ধরা হয় না। এরা এককোষী এবং প্রকৃতকোষী, এদেরকে বর্তমানে প্রোটিস্টা রাজ্যের অধীনে রাখা হয়েছে।

জীবজগতের শ্রেণিবিন্যাস আমরা মারগুলিস ও হুইটেকারের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী পড়েছি। তার পরবর্তীতেও বিভিন্নজন ভিন্ন ভিন্নভাবে, যেমন তিন রাজ্যে বা ছয় রাজ্যে বিন্যাস করতে চেয়েছেন। তবে সেসব নিয়ে বিস্তারিত জানা আমাদের আপাতত প্রয়োজন নেই।