জীববিজ্ঞান আমাদের জন্য একেবারে নতুন না। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে আমরা বিজ্ঞান বইয়ে জীবজগৎ নিয়ে অনেক কিছু পড়েছি। জীবের শ্রেণিবিন্যাস, নামকরণ, কোষের গঠন, কোষ বিভাজন, বিভিন্ন জৈবনিক প্রক্রিয়া প্রভৃতি অনেক কিছুই আসলে আগের শ্রেণিগুলোতে চলে এসেছে। নবম-দশম শ্রেণিতে তার কিছু আলোচনা আবারো আসবে। যদি আগের কোন পড়া মনে না থাকে, ভয় নেই, আমরা নতুন করে শুরু করতে চলেছি।

So, welcome to science at its messiest and wildest. Welcome to Biology.

সুপ্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন উদ্ভিদ, প্রাণী এবং জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিভিন্নভাবে চিন্তা ও অধ্যয়ন করে এসেছে মানুষ। চিকিৎসাবিদ্যা, কৃষি, দর্শন বিভিন্ন বিষয়ের মধ্য দিয়ে হয়েছে সে চর্চা। তবে জীববিজ্ঞান আজকের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে অষ্টাদশ-উনবিংশ শতাব্দিতে আধুনিক বিজ্ঞানের উত্থানের সাথে। গ্রিক শব্দ Bios অর্থ জীবন, logos অর্থ জ্ঞান। সেখান থেকে Biology, বাংলা প্রতিশব্দ জীববিজ্ঞান- জীবন সম্পর্কিত বিজ্ঞান।

জীববিজ্ঞান: বিজ্ঞানের যে শাখায় জীব ও জীবন নিয়ে আলোচনা করা হয়।

এই পর্যন্ত খুব সহজ। কিন্তু তাহলে একটু আগে messiest আর wildest কেন বললাম? চলো একটু চিন্তা করি, বিজ্ঞানে কি জীব ও জীবন নিয়ে আলোচনা আসলেই সম্ভব?

বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান

বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রয়োগক্ষেত্র নিয়ে আলোচনায় আমরা বলেছিলাম বিজ্ঞানে আমরা ভৌত জগৎ নিয়ে কাজ করি। ভৌত জগৎ বলতে ভর ও শক্তির সমন্বয়ে যা কিছু তৈরি। যা আমাদের পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণের সীমানার মধ্যে। প্রশ্ন চলে আসে, জীবনকে কি শুধু ভর ও শক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়?

আমাদের এই যে নিজেদের অস্তিত্বকে অনুভব করতে পারা, চিন্তাশক্তি, ইচ্ছাশক্তি, আবেগ, আনন্দ বা যন্ত্রণার অনুভূতি- এই ব্যাপারগুলো কি শুধুই জড় পদার্থের জটিল সমন্বয়, নাকি তার থেকে আলাদা কিছু?

বিজ্ঞানের সীমারেখার মধ্যে সত্যি বলতে এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর খোঁজা কঠিন। আমি যেটা মনে করি, আমাদের চৈতন্য বা consciousness এর পেছনে খুব সম্ভবত এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু কাজ করে, আর তার প্রকাশ ঘটে বিভিন্ন রাসায়নিক আর ভৌত প্রক্রিয়ায়।

তবে যাই হোক, দিনশেষে জীবদেহের গঠন আর বিভিন্ন কার্যকলাপের জন্যে পদার্থবিজ্ঞান আর রসায়নের বিশ্বজনীন নিয়মগুলো একটুও ভিন্ন না। একটা গাড়ি কিংবা গড়িয়ে দেয়া বলের গতি পদার্থবিজ্ঞানের যে সূত্র মেনে চলে, আমাদের হাঁটাচলা বা চিতাবাঘের শিকারের পেছনে দৌঁড়ানোর জন্য সূত্রগুলো এতটুকুও বদলায় না। আমাদের দেহের মধ্যে শক্তি উৎপাদন, পরিবেশের প্রতি প্রতিক্রিয়া প্রভৃতি বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার এক আশ্চর্য সন্নিবেশ। কাজেই হয়ত জীব কিংবা জীবনের সব রহস্যের সমাধান বিজ্ঞানের সীমারেখায় আমরা খুঁজে পাবো না, তবে জীব ও জীবনকে বুঝতে বিজ্ঞান আমাদের নিশ্চয়ই সাহায্য করতে পারে।

জীব ও জীবন

আমরা নিজেদের অস্তিত্বকে যে অনুভব করতে পারি, সম্ভবত সহজাতভাবে আমাদের কাছে জীবনের ধারণা এটাই। কিন্তু অন্য জীবদের জন্যও কি এটা সত্য? একটা আণুবীক্ষণিক ব্যাকটেরিয়ার কি কোন ধরণের অনুভূতি বা চিন্তাশক্তি আছে? যদি না থাকে, তাহলে সেটা জীব নাকি জড়? এরকম প্রশ্নের উত্তরগুলো দেয়া খুব কঠিন।

আমাদের আগের আলোচনার ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রয়োজন এমন কিছু যা আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারবো। এজন্য জীবকে আমরা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে চিহ্নিত করি- বৃদ্ধি, বিকাশ, পুষ্টি লাভ, শক্তির রূপান্তর, উদ্দীপনায় সাড়া দেয়া ও পরিবর্তিত পরিবেশে অভিযোজনের ক্ষমতা- এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে আমরা জীবনের বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করি এবং যার মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলো উপস্থিত, তাকে আমরা জীব বলি।

জীববিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়

রসায়নের সাথে জীববিজ্ঞানের সম্পর্কটা অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। আমাদের দেহে প্রতিনিয়ত অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটছে। জীবের কার্যকলাপ আসলে অজস্র রাসায়নিক প্রক্রিয়ার এক সুনিপুণ সমাবেশ। যেমন আমাদের বিভিন্ন খাদ্য উপাদান, পুষ্টি, শক্তি উৎপাদন এই বিষয়গুলো। এমনকি আমাদের দেহের সামগ্রিক সমন্বয় রক্ষা, বিভিন্ন অনুভূতি মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়া, সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন এই সবকিছু বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়।

তবে জীববিজ্ঞানে আমরা শুধু রসায়ন পড়বো না। জীবের বৈচিত্র ও শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে আমরা জানবো, জীবদেহের গঠন ও কাজ নিয়ে জানবো, জীবের আচরণ নিয়ে অধ্যয়ন করব, বংশগতির মধ্য দিয়ে কীভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বৈশিষ্ট্যের স্থানান্তর হয় জানবো, এত বৈচিত্রময় জীবের উদ্ভব কীভাবে হলো সে রহস্যের উত্তর খুঁজবো, জীব আর পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে পড়বো।

বিজ্ঞানে জানার পাশাপাশি আমাদের আরেকটা উদ্দেশ্য জ্ঞানকে প্রয়োগ করা। জীববিজ্ঞানের জ্ঞানকে আমরা কৃষি, চিকিৎসা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এরকম বিভিন্ন জায়গায় কাজে লাগাতে পারি।

এভাবে জীববিজ্ঞানের আলোচনার পরিধি বিস্তৃত। যে শাখাগুলোতে জীববিজ্ঞান নিয়ে তত্ত্বীয় (theoratical) আলোচনা হয়, সেগুলো মৌলিক বা ভৌত জীববিজ্ঞান (pure or basic biology)। আর যে শাখাগুলোতে প্রায়োগিক আলোচনা হয়, সেগুলো ফলিত জীববিজ্ঞান (applied biology)।

মৌলিক জীববিজ্ঞান ও ফলিত জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বিষয়ে পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা ৪ ও ৫-এ উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণার জন্য একবার দেখে নিও।