প্রজাতির ধারণা

প্রজাতি: সাধারণভাবে যে জীবগুলো নিজেদের মধ্যে প্রজননের মাধ্যমে উর্বর বংশধর সৃষ্টি করতে পারে, তাদের নিয়ে একটি প্রজাতি তৈরি হয়।

উর্বর বংশধর বলতে যারা পুনরায় প্রজননে অংশ নিয়ে বংশবৃদ্ধির ধারা চালু রাখতে সক্ষম।

শ্রেণিবিন্যাসের আল্টিমেট উদ্দেশ্য হলো প্রত্যেকটা প্রজাতিকে আলাদা আলাদাভাবে জানা। প্রজাতির সদস্যদের মধ্যেও ভিন্নতা থাকে। আমার আর তোমার মধ্যে পার্থক্য তো আছে, কিন্তু এই পার্থক্যের পরও দিনশেষে আমরা দুজনই যে মানুষ- এই পর্যন্ত চিহ্নিত করা শ্রেণিবিন্যাসের উদ্দেশ্য।

আবার, সব মানুষ এক প্রজাতি, সব গরু এক প্রজাতি। তবে সবক্ষেত্রে আমরা একই নামে ডাকলেই এক প্রজাতি না। যেমন চিংড়ির মধ্যে গলদা চিংড়ি আর বাগদা চিংড়ি এক প্রজাতি না।

ধারণা করা হয়, প্রজাতির সংখ্যা ১ কোটির কাছাকাছি হতে পারে। পাঠ্যবইয়ের তথ্য (যেটা আসলে অনেক বছর ধরে আপডেট হয়নি) অনুযায়ী এখন পর্যন্ত বর্ণনাকৃত উদ্ভিদের প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষ ও প্রাণীর প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ১৩ লক্ষ।

শ্রেণিবিন্যাস

জীবের মধ্যে উদ্ভিদ আর প্রাণী- এই পার্থক্যটা যে আছে এটা বোঝার জন্য আসলে আলাদাভাবে গবেষণা করার প্রয়োজন নেই। প্রাণী চলাফেরা করতে পারে, উদ্ভিদ পারে না- এটা বোধহয় আমাদের জন্য সবচেয়ে দৃশ্যমান পার্থক্য।

কিন্তু আমরা যখন আরেকটু গবেষণা করতে শুরু করলাম, শুধু বাইরে থেকে না দেখে ভেতরের গঠন-বৈশিষ্ট্য অধ্যয়ন করতে শুরু করলাম- তখন আমরা দেখলাম শুধু উদ্ভিদ আর প্রাণী এই ভাগদুটো ঠিক যথেষ্ট হচ্ছে না।

যেমন ছত্রাকের কথা চিন্তা কর। গাছের গোড়ায় ব্যাঙের ছাতা তো নিশ্চয়ই দেখেছ? বাইরে থেকে আর সব আগাছার মত দেখাতে পারে, সবুজ পাতা না থাকলেও উদ্ভিদের মতই তো নিশ্চল। কিন্তু যদি তুমি ছত্রাকের গঠন-বৈশিষ্ট্য দেখো, কিছু কিছু জায়গায় উদ্ভিদ থেকে বরং প্রাণীর সাথেই বেশি মিলে। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ পদ্ধতিতে খাদ্য তৈরি করে, ছত্রাক শোষণ পদ্ধতিতে খাদ্য গ্রহণ করে। আবার ছত্রাকের কোষের গঠনও উদ্ভিদকোষের মত না।

আবার ব্যাকটেরিয়ার কথা চিন্তা কর। এদের গঠন যেকোন উদ্ভিদ বা প্রাণীর তুলনায় অত্যন্ত সরল- একটা মাত্র আণুবীক্ষণিক কোষ, তাও খুবই সরল গঠনের। কিন্তু অন্যদিকে এদের অনেকেরই একরকম চলাফেরার ক্ষমতা আছে, আবার কিছু ব্যাকটেরিয়া সালোকসংশ্লেষণও করতে পারে। তাহলে এদের উদ্ভিদ বা প্রাণী কোনটা বলা ঠিক হবে?

ক্যারোলাস লিনিয়াসের শ্রেণিবিন্যাস

শ্রেণিবিন্যাসে বড় একটা কাজ করেছিলেন সুইডিস প্রকৃতিবিদ ক্যারোলাস লিনিয়াস (1707-1778)। তার শ্রেণিবিন্যাসে দুটো রাজ্যই ছিলো- উদ্ভিদজগৎ আর প্রাণীজগৎ। এটুকু নতুন ছিলো না। তবে তিনি উদ্ভিদজগৎ আর প্রাণীজগতকে ধাপে ধাপে আরো বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেন। অর্থাৎ ধরা যাক, তেলাপোকা আর মানুষ, দুটোই তো প্রাণী। দুটোকেই আমি প্রাণীজগতে রাখবো ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে একটাকে আমি পতঙ্গ শ্রেণিতে রাখবো, অন্যটাকে মেরুদন্ডী শ্রেণিতে। ক্যারোলাস লিনিয়াসের আরেকটা অসাধারণ কাজ ছিলো প্রত্যেকটা জীব প্রজাতির নামকরণের পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা।

মারগুলিস ও হুইটেকারের শ্রেণিবিন্যাস

১৯৬৯ সালের মধ্যে জীবের গঠন-বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমরা অনেকটা জানতে পেরেছিলাম। আর. এইচ. হুইটেকার তখন DNA এবং RNA-এর প্রকারভেদ, কোষের বৈশিষ্ট্যসংখ্যা এবং খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে জীবজগৎকে ৫টি রাজ্যে ভাগ করার প্রস্তাব দেন। এটাকে আমরা বলি পঞ্চরাজ্য (Five Kingdom) শ্রেণিবিন্যাস।

১৯৭৪ সালে মারগুলিস কোষের নিউক্লিয়াসের গঠনের ভিত্তিতে দুটো সুপার কিংডম বা অধিরাজ্য নিয়ে আসেন, তার মধ্য হুইটেকারের ৫টি রাজ্যকে বিন্যাস করেন।

লিনিয়াস ধাপে ধাপে শ্রেণিবিন্যাসের যে ধারা চালু করেছিলেন, তা এখানে বজায় থাকে। অর্থাৎ, দুটো অধিরাজ্যের ভেতরে পাঁচটি রাজ্য, আবার রাজ্যগুলোর ভেতরে বিভিন্ন পর্ব, শ্রেণি প্রভৃতিতে বিভিন্ন প্রজাতিগুলোকে স্থান দেয়া।

মারগুলিস ও হুইটেকারের শ্রেণিবিন্যাস-

  • সুপার কিংডম 1: প্রোক্যারিওটা (আদিকোষী)
    • রাজ্য ১: মনেরা
  • সুপার কিংডম 2: ইউক্যারিওটা (প্রকৃতকোষী)
    • রাজ্য ২: প্রোটিস্টা
    • রাজ্য ৩: ফানজাই
    • রাজ্য ৪: প্লান্টি
    • রাজ্য ৫: অ্যানিমেলিয়া