জীবকোষ ও কোষের প্রকারভেদ
জীবকোষ
রবার্ট হুক যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে একটা উদ্ভিদজাত কর্কের ছিপি দেখছিলেন। তিনি দেখলেন কিছুটা মৌচাকের মত অনেকগুলো খোপ যেন সাজানো। সেটাই ছিলো জীবকোষের আবিষ্কার। তার দেখা সেই দৃশ্যের একটা ছবিও এঁকে ফেললেন তিনি, যেটা ১৬৬৫ সালে তার বই Micrographia-তে প্রকাশ করেন তিনি। যেকারণে আজও আমরা দেখতে পারি তার চোখে উদ্ভিদকোষ কেমন ছিলো।

ছবি: রবার্ট হুকের আঁকা কর্কের মধ্যে কোষের বিন্যাস
আমাদের দেহও এরকম একটার পর একটা কোষের বিন্যাসে তৈরি। আমরা খালিচোখে দেখতে পাই না যদিও। সাধারণত কোষ অত্যন্ত ক্ষুদ্র, অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখা যায় না। তবে ব্যতিক্রম আছে। যেমন উটপাখির ডিম হলো সর্ববৃহৎ কোষ। মুরগি বা বিভিন্ন পাখির ডিম একটাই কোষ দিয়ে তৈরি। মায়ের গর্ভে মানুষেরও জীবন শুরু হয় একটামাত্র কোষ থেকে। পরে সেই কোষ বিভাজিত হয়ে নতুন কোষ, তারপর সেগুলো আবারো বিভাজিত হয়ে আরো কোষ, এভাবে অসংখ্য কোষের জীবদেহ তৈরি হয়।
একটা বিল্ডিং যেমন একটার পর একটা ইট বসিয়ে তৈরি হয়, কোষ একটা জীবদেহের জন্য খানিকটা তেমনই। আমাদের দেহও অসংখ্য কোষ দিয়ে গঠন হয়েছে। যেকারণে কোষ হলো জীবদেহের গাঠনিক একক।
আবার জীবদেহের যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো আছে- যেমন, শক্তি উৎপাদন, বৃদ্ধি, পরিবেশের প্রতি সাড়া প্রভৃতি, কোষ হলো সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম অংশ যা জীবের এই বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ করে। এই কারণে কোষ জীবদেহের কার্যিক এককও।
তাহলে কোষ কী? লোয়ি ও সিকেভিজ ১৯৬৯ সালের কোষের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন- বৈষম্য ভেদ্য পর্দা দিয়ে আবৃত এবং জীবজ ক্রিয়াকলাপের একক যা অন্য সজীব মাধ্যম ছাড়াই নিজের প্রতিরূপ তৈরি করতে পারে, এমন সত্তা।
আমরা তিনটা কথা দেখছি এই সংজ্ঞাতে। বৈষম্য ভেদ্য পর্দা দিয়ে আবৃত- মানে একটা পর্দা দিয়ে কোষের সীমারেখা টানা থাকবে। কিন্তু পর্দাটা একেবারে অভেদ্য না, বৈষম্য ভেদ্য- কিছু কিছু উপাদান তার মধ্য দিয়ে চলাচল করতে পারবে। জীবজ ক্রিয়াকলাপের একক কেন, তা তো আমরা আলোচনা করেছিই। আর কোষের আরেকটা বৈশিষ্ট্য- যেটা জীবেরও একটা বড় পরিচয়, কোষ নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারে, যার মাধ্যমে জীবের বৃদ্ধি ও বিকাশ হয় এবং বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে জীব টিকে থাকে।
কোষের প্রকারভেদ
নিউক্লিয়াসের গঠনের ভিত্তিতে
আমরা আগের অধ্যায়েই কিছুটা আলোচনা করেছি। নিউক্লিয়াসের গঠনের ভিত্তিতে কোষ দুই প্রকার।
১. আদিকোষ বা প্রাককেন্দ্রিক কোষ (Prokaryotic cell)
- সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না, ফলে আদি নিউক্লিয়াসযুক্ত কোষ বা আদিকোষ বলা হয়
- নিউক্লিয়াস পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে না, নিউক্লিও-বস্তুগুলো কোষের সাইটোপ্লাজমে ছড়ানো থাকে
- আবরণী ঘেরা কোন অঙ্গাণু যেমন- প্লাস্টিড, মাইটোকন্ড্রিয়া, এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা ইত্যাদি নেই
- আবরণীবিহীন অঙ্গাণুর মধ্যে রাইবোজম থাকে
- ক্রোমোজোমে কেবলমাত্র DNA থাকে
- উদাহরণ- ব্যাকটেরিয়া, নীলাভ সবুজ শৈবাল (সায়ানোব্যাকটেরিয়া)
কোষ বিভাজন ও বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়াতে ক্রোমোজম ও রাইবোজোম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পাশাপাশি কোষের অন্যান্য কার্যকলাপ যেমন শক্তি উৎপাদন প্রভৃতির জন্য আদিকোষের সাইটোপ্লাজমে কিছু কিছু উপাদান থাকে, তবে সেগুলো সুসংগঠিত অঙ্গাণু না।
২. প্রকৃতকোষ বা সুকেন্দ্রিক কোষ (Eukaryotic cell)
- সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে, অর্থাৎ নিউক্লিয়ার ঝিল্লি (neuclear membrane) দিয়ে নিউক্লিও-বস্তু পরিবেষ্টিত ও সুসংগঠিত
- বিভিন্ন আবরণীযুক্ত এবং রাইবোজোমসহ বিভিন্ন আবরণীবিহীন অঙ্গাণু উপস্থিত থাকে
- ক্রোমোজোমে DNA-র পাশাপাশি প্রোটিন, হিস্টোন প্রভৃতি থাকে
- উদাহরণ- অ্যামিবা, ছত্রাক, উন্নত উদ্ভিদ ও প্রাণী
কাজের ভিত্তিতে
বহুকোষী জীবের ক্ষেত্রে কাজের ভিত্তিতে কোষ দুই প্রকার- দেহকোষ ও জননকোষ
১. দেহকোষ (Somatic cell)
- বহুকোষী জীবের দেহ গঠনে অংশগ্রহণ করে, বিভিন্ন টিস্যু, অঙ্গ ও তন্ত্র গড়ে তোলে
- মাইটোসিস বিভাজন প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয় এবং এভাবে দেহের বৃদ্ধি ঘটে
২. জননকোষ (Gametic cell)
- যৌন জনন ও জনুঃক্রম দেখা যায় এমন জীবে জননকোষ তৈরি হয়
- ডিপ্লয়েড জীবে জননমাতৃকোষে মিয়োসিস বিভাজনের মধ্য দিয়ে জননকোষ তৈরি হয়
- অপত্য জননকোষে ক্রোমোজমের সংখ্যা জননমাতৃকোষের অর্ধেক
কোষ বিভাজনের ক্ষেত্রে যে কোষ বিভাজিত হয় তাকে মাতৃকোষ এবং যে কোষগুলো সৃষ্টি হয় তাকে অপত্য কোষ (daughter cell) বলা হয়।
ডিপ্লয়েড কোষে ক্রোমোজোমগুলো জোড়া আকারে (2n) থাকে। মিয়োসিস বিভাজনের ক্ষেত্রে ডিপ্লয়েড কোষ থেকে হ্যাপ্লয়েড কোষ সৃষ্টি হয়, যেখানে ক্রোমোজোম সংখ্যা অর্ধেক (n)। পরে দুটি জননকোষ মিলিত হলে পুনরায় ডিপ্লয়েড কোষ তৈরি হয়। এরকম জীবনে হ্যাপ্লয়েড ও ডিপ্লয়েড দশার মধ্যে আবর্তন থাকলে তাকে জনুঃক্রম বলে।
জাইগোট: পুং ও স্ত্রী জননকোষ মিলিত হয়ে প্রথম সৃষ্ট কোষকে জাইগোট বলে।
জননকোষ সর্বদা হ্যাপ্লয়েডধর্মী হয়। অন্যদিকে জননকোষের মিলনে সৃষ্ট জাইগোট সবসময় ডিপ্লয়েডধর্মী।
উন্নত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহকোষ ডিপ্লয়েডধর্মী। এক্ষেত্রে জননমাতৃকোষে মিয়োসিস প্রক্রিয়া ঘটে এবং জননকোষগুলো মিলিত হয়ে জাইগোট তৈরির পর পুনরায় ডিপ্লয়েড দশা শুরু হয়। অন্যদিকে ছত্রাকসহ কিছু জীবের দেহকোষ হ্যাপ্লয়েডধর্মী। তাদের জাইগোট গঠনের পর জাইগোটে মিয়োসিস হওয়ার মধ্য দিয়ে পুনরায় হ্যাপ্লয়েড দশা শুরু হয়।
মনে রাখতে হবে, জননমাতৃকোষ থেকে জননকোষ তৈরি হয়, কিন্তু জননমাতৃকোষ নিজে মূলত দেহকোষ।