ঝিল্লিযুক্ত সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণু - মাইটোকন্ড্রিয়া ও প্লাস্টিড
সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণুগুলোর মধ্যে মাইটোকন্ড্রিয়া ও প্লাস্টিড সবচেয়ে জটিল গঠনের। জীবের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য দুটো প্রক্রিয়ায় এরা মূল ভূমিকা পালন করে- শ্বসন ও সালোকসংশ্লেষণ। প্রাণীদেহে প্লাস্টিড নেই সত্য, তবে তারাও খাদ্যের জন্য সালোকসংশ্লেষণকারী উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে খাদ্যের মধ্যে সঞ্চিত শক্তিকে জীবের ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর হয় শ্বসন প্রক্রিয়াতে।
মাইটোকন্ড্রিয়া
আবিষ্কার: রিচার্ড অল্টম্যান (তিনি এর নাম দেন বায়োব্লাস্ট)
মাইটোকন্ড্রিয়া নামকরণ: কার্ল বেনডা
প্রধান কাজ: জীবের শ্বসনকার্যে অংশ নেয়া ও শক্তি উৎপাদন
শক্তি উৎপাদনে মাইটোকন্ড্রিয়ার ভূমিকা
জীবের কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য শক্তি প্রয়োজন। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় যে খাদ্য তৈরি করে, বা প্রাণীরা যে খাদ্য খায়- তাতে শক্তি সঞ্চিত থাকে। কিন্তু জীব সরাসরি এই শক্তি ব্যবহার করতে পারে না। শ্বসন প্রক্রিয়ায় খাদ্য থেকে জীবের ব্যবহারযোগ্য শক্তি উৎপন্ন হয়। শ্বসন প্রক্রিয়া বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সংগঠিত হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চতুর্থ অধ্যায়ে আসবে।
শ্বসনের চারটি ধাপ আছে- গ্লাইকোলাইসিস, অ্যাসিটাইল কো-এ সৃষ্টি, ক্রেবস চক্র ও ইলেকট্রন প্রবাহতন্ত্র। প্রথম ধাপের বিক্রিয়াগুলো কোষের সাইটোপ্লাজমে সংগঠিত হয়। পরবর্তী তিনটি ধাপ মাইটোকন্ড্রিয়াতে ঘটে। ক্রেবস চক্রে সর্বাধিক শক্তি উৎপন্ন হয়। যেকারণে মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র বা পাওয়ার হাউজ বলা হয়।
প্রায় সকল সুকেন্দ্রিক কোষ বা প্রকৃতকোষে মাইটোকন্ড্রিয়া উপস্থিত থাকে। আদিকোষে মাইটোকন্ড্রিয়া থাকে না। সেখানে ভিন্ন প্রক্রিয়াতে শ্বসন ঘটে ও কম শক্তি উৎপন্ন হয়। প্রকৃতকোষের মধ্যে কিছু প্রোটোজোয়াতে মাইটোকন্ড্রিয়া থাকে না।
মাইটোকন্ড্রিয়ার গঠন ও উৎপত্তি

ছবি: মাইটোকন্ড্রিয়া ও মাইটোকন্ড্রিয়ার লম্বচ্ছেদ
মাইটোকন্ড্রিয়ার আবরণী বা ঝিল্লি দুই স্তরবিশিষ্ট। ভেতরের স্তরটি ভেতরের দিকে আঙ্গুলের মত ভাঁজ হয়ে থাকে। এই ভাঁজ হয়ে থাকা গঠনকে ক্রিস্টি বলে। ক্রিস্টির ভেতরে বৃন্তযুক্ত গোলাকার বস্তু লেগে থাকে, যাদের অক্সিজোম (oxisomes) বলে। অক্সিজোম বিভিন্ন এনজাইম বা উৎসেচক ধারণ করে, যা শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন। মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরে ম্যাট্রিক্স নামক তরলে পূর্ণ থাকে।
প্লাস্টিড
আবিষ্কার: আর্নস্ট হেকেল
প্লাস্টিড তিন ধরণের- ক্লোরোপ্লাস্ট (সবুজ), ক্রোমোপ্লাস্ট (রঙিন) ও লিউকোপ্লাস্ট (বর্ণহীন)
প্রধান কাজ: ক্লোরোপ্লাস্ট - খাদ্য প্রস্তুত করা ক্রোমোপ্লাস্ট - উদ্ভিদ দেহকে বর্ণময় ও আকর্ষণীয় করে পরাগায়নে সাহায্য করা লিউকোপ্লাস্ট - খাদ্য সঞ্চয় করা
ক্লোরোপ্লাস্ট
সবুজ রঙের প্লাস্টিডকে ক্লোরোপ্লাস্ট বলে। ক্লোরোফিল নামক রঞ্জক পদার্থ ক্লোরোপ্লাস্টের বর্ণ প্রদান করে। এছাড়া অন্যান্য বর্ণের ক্যারটিনয়েড থাকতে পারে।
প্রাপ্তিস্থান: উদ্ভিদের পাতা, কচি কান্ড ও অন্যান্য সবুজ অংশ
ক্লোরোপ্লাস্টে খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়া

ছবি: প্লাস্টিডের গঠন
ক্রোমোপ্লাস্ট
ক্রোমোপ্লাস্ট হলো সবুজ ব্যতীত অন্যান্য বর্ণের রঙিন প্লাস্টিড। এখানে ক্লোরোফিল থাকে না। রঞ্জক পদার্থ হিসেবে থাকে জ্যান্থফিল (হলুদ), ক্যারোটিন (কমলা), ফাইকোএরিথ্রিন (লাল), ফাইকোসায়ানিন (নীল) প্রভৃতি।
প্রাপ্তিস্থান: রঙিন ফুল, রঙিন পাতা, গাজরের মূল
ক্রোমোপ্লাস্ট উদ্ভিদের ফুল, পাতা এবং অন্যান্য অংশকে আকর্ষণীয় করে তোলে। ফুলকে আকর্ষণীয় করে তোলার মাধ্যমে পরাগায়নে সাহায্য করা এদের প্রধান কাজ।
লিউকোপ্লাস্ট
যেসব প্লাস্টিডে কোন রঞ্জক থাকে না, অর্থাৎ বর্ণহীন প্লাস্টিডকে লিউকোপ্লাস্ট বলে।
প্রাপ্তিস্থান: উদ্ভিদের যেসব অঞ্চলে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, যেমন মূল, ভ্রুণ, জননকোষ প্রভৃতি
লিউকোপ্লাস্টের প্রধান কাজ খাদ্য সঞ্চয় করা। আলোর সংস্পর্শে আসলে লিউকোপ্লাস্ট কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্লোরোপ্লাস্টে রূপান্তর হতে পারে।
মাইটোকন্ড্রিয়া ও প্লাস্টিডের উৎপত্তি
মাইটোকন্ড্রিয়া ও প্লাস্টিডের গঠনের ছবিগুলো তুমি যদি দেখো, এরা ঝিল্লিতে আবদ্ধ এবং এদের নিজস্ব DNA ও রাইবোজম আছে। যদি চিন্তা কর, প্রকৃতকোষের একটা অঙ্গাণু হলেও এদের গঠন পূর্ণাঙ্গ একটা আদিকোষের মত!
Biology-কে science at its messiest and wildest বলেছিলাম না? মাইটোকন্ড্রিয়া নিয়ে খুব অদ্ভুত একটা তত্ত্ব আছে, তোমাদের বইয়ে মাইটোকন্ড্রিয়ার আলোচনায় তার দিকে কিছুটা ইঙ্গিত করা হয়েছে-
“প্রাকেকেন্দ্রিক কোষে মাইটোকন্ড্রিয়া থাকে না। এমনকি কিছু সুকেন্দ্রিক কোষেও (যেমন: Trichomonas, Monocercomonoides ইত্যাদি প্রোটেজোয়াতে) মাইটোকন্ড্রিয়া অনুপস্থিত। তাহলে এমন কি হতে পারে যে বিবর্তনীয় ইতিহাসের কোনো এক সময়ে সুকেন্দ্রিক কোষের ভিতর মাইটোকন্ড্রিয়া (কিংবা তার পূর্বসূরী) ঢুকে পড়েছিল এবং তারপর থেকে সেটি কোষের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছে? এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্ত থেকে এই ব্যাখ্যাটিই অনুমান করা হয়।”
তত্ত্বটা এরকম যে, মাইটোকন্ড্রিয়া এবং প্লাস্টিড এরা মূলত স্বাধীন ব্যাকটেরিয়া ছিলো। প্রকৃতকোষের উৎপত্তির শুরুর দিকে এরা কোষের ভেতরে মিথোঃজীবী ব্যাকটেরিয়া হিসেবে ঢুকে পড়ে, এবং প্রকৃতকোষের পুনরুৎপাদনের সাথে কোষের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে থেকে গেছে। সত্যি বলতে এই তত্ত্ব পড়ার পর থেকে আমি একরকম অস্বস্তি অনুভব করছি, তবে মাইটোকন্ড্রিয়ার উৎপত্তি নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে এই ধারণাটাই সমাদৃত।