পরশ পাথর, গিলোটিন ও রসায়নের গল্প
রসায়নের শুরুটা আমরা যদি খুঁজে বের করতে চাই, তবে চমকপ্রদ কিছু গল্প আমাদের সামনে আসবে। আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই সময়টাতে, যখন মানুষ সন্ধান করছিলো এক আশ্চর্য পরশ পাথরের। যে পাথর সীসাকে পরিণত করতে পারে সোনায়, আর মানুষকে দিতে পারে অমরত্ব।
খ্রিস্টপূর্ব সময়ের প্রাচীন মিশরের কিছু কিছু চর্চায় তার শুরুটা আমরা দেখি, ভারতীয় ও চীনা সভ্যতার কিছু কিছু কাজও সেই গল্পের অংশ। তবে এই গল্প তার ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছায় আব্বাসীয় খেলাফতের সময়কার ইসলামী সভ্যতায়, খ্রিস্টাব্দ অষ্টম শতকের দিকে। যেখানে প্রাচীন খন্ডগুলো একসাথে হয়ে এই চর্চা আনুষ্ঠানিক রূপ নিতে থাকে। গবেষণাগারে পরীক্ষা-নীরিক্ষা এই চর্চার অংশ হয়ে ওঠে। ৮ম শতকের দিকে জাবির-ইবনে-হাইয়ান প্রথম পরীক্ষাগারে আলকেমি চর্চা শুরু করেন। তাকে অনেক সময় রসায়নের জনক বলা হয়।
মধ্যযুগের সেসব চর্চাকে বলা হত আলকেমি (Alchemy)। আলকেমি এখনকার রসায়নের থেকে ভিন্ন ছিলো এই জায়গাতে যে এটা শুধু পদার্থ নিয়ে কাজ ছিলো না, অমরত্ব বা বিশুদ্ধতার মত আধ্যাত্মিক প্রেরণা ছিলো এর বড় অংশ।
গল্পের এন্টি-ক্লাইমেক্স হলো পরশ পাথরের সন্ধান মানুষ কখনো পায়নি। অমরত্ব লাভ কিংবা সীসাকে স্বর্ণে পরিণত করার লক্ষ্যও পূরণ হয়নি। তবে এর মধ্য দিয়ে মানুষ পদার্থের রূপান্তর নিয়ে জেনেছে অনেক কিছু। আর দার্শনিক কিংবা সাহিত্যিকদেরকে আজও চিন্তার খোরাক দেয় পরশ পাথর বা Philosopher’s Stone খোঁজার দিনগুলো। কখনো কখনো আমাদের যাত্রাগুলো হয়ত আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেয় না, তবে একদম খালি হাতেও ফেরায় না।
তারও অনেক অনেক আগের কথা, যখন এক সংকর ধাতুর আবিষ্কার বদলে দিয়েছিলো যুগের গতিপথ। হাতিয়ার তৈরির জন্য ধাতু হিসেবে কপার ছিলো অনেক বেশি নমনীয়, আর টিন ছিলো অনেক বেশি ভঙ্গুর। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দের দিকে মানুষ কপার আর টিনকে গলিয়ে মিশ্রণ তৈরি করতে শেখে। এই মিশ্রণ ঠান্ডা হলে কঠিন সংকর (একাধিক ধাতুর মিশ্রণে তৈরি) ধাতুতে পরিণত হয়, যে ধাতুকে বলা হয় ব্রোঞ্জ। হাতিয়ার তৈরির জন্য এই ধাতু ছিলো অত্যন্ত উপযুক্ত।
ব্রোঞ্জের আবিষ্কারের প্রভাব ছিলো এতটাই বেশি যে খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ থেকে ১২০০ সময়কালকে এখন ব্রোঞ্জ যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পশু শিকার, কৃষিকাজ, বা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে ব্যবহার হত ব্রোঞ্জের হাতিয়ার। যে সভ্যতাগুলো ব্রোঞ্জের ব্যবহার করতে শিখেছিলো, যুদ্ধে বা, অন্য রাজ্য দখলে পাথরের হাতিয়ারের বিপরীতে তারা সুনিশ্চিতভাবে এগিয়ে থাকতো। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে এক সভ্যতা থেকে অন্য সভ্যতার মধ্যে বড় ব্যবধান গড়ে দেয়া আবিষ্কারগুলোর অন্যতম ছিলো এই ব্রোঞ্জ। আধুনিক সময়টাও কি তার থেকে ভিন্ন? রাসায়নিক অস্ত্র, পারমাণবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ দেশগুলোকে পৃথিবী এখনো সমীহ করে চলে। যুদ্ধের রূপ বদলেছে, কিন্তু বাস্তবতা বদলায়নি।
অ্যান্টনিও ল্যাভয়সিয়েকে আধুনিক রসায়নের জনক বলা হয়। পরীক্ষামূলকভাবে দহনে অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ, রাসায়নিক নামকরণপদ্ধতির সূচনা, ভরের নিত্যতা ও পরিমাণগত রসায়নের ভিত্তি স্থাপনসহ রসায়নের বিকাশে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখেন ল্যাভয়সিয়ে, সময়টা ১৮শ শতক।
ল্যাভয়সিয়ের গল্পটা অসম্পূর্ণ তার জীবনের শেষের গল্পটা ছাড়া। কর-সংগ্রাহক কোম্পানি Ferme générale এর সদস্য ছিলেন তিনি, যারা নিজেদের কমিশন রেখে ফরাসি সরকারের হয়ে ট্যাক্স সংগ্রহ করে দিত। ফরাসি বিপ্লবের সময় ল্যাভয়সিয়ের এই সংযোগ তাকে বিপ্লবীদের চক্ষুশূল করে তোলে। বিপ্লবের পর ল্যাভয়সিয়ের বিরুদ্ধে কর জালিয়াতি ও ভেজাল তামাক বিক্রির অভিযোগ আনা হয়। ৫০ বছর বয়সে গিলেটিনে মৃত্যুদন্ডে জীবনের সমাপ্তি হয় তার জীবনের। ক্ষমতার পালাবদলের অদ্ভুত নিয়মে মৃত্যুদন্ডের দেড় বছর পর তাকে আবার সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দেয়া হয়।
গল্প শেষ এখনকার মত। রসায়নের কথায় আসি।
রসায়ন: প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের যে শাখা পদার্থের অভ্যন্তরীণ গঠন, উপাদান, ধর্ম, রূপান্তর ও রূপান্তরে শক্তির পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে তাকে রসায়ন বলে।
রসায়নের ইংরেজি প্রতিশব্দ Chemistry। মিশরীয় শব্দ কিমি (Chemi বা Kimi) শব্দ থেকে আরবি আল-কিমিয়া শব্দ এসেছে। সেখান থেকে আলকেমি। সেখান থেকে আবার কিমি বা Chemi-তে ফিরে যেয়ে Chemistry শব্দ এসেছে।
প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আর সব শাখার মতই আধুনিক রসায়ন পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও রিজনিংনির্ভর। রসায়নে পদার্থের গঠন নিয়ে আমাদের বিশেষ আগ্রহ থাকবে। এবং ভিন্ন ভিন্ন পদার্থকে নির্দিষ্ট পরিবেশে একত্র করলে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন কেমন হয় তা আমরা দেখার চেষ্টা করব।
আলকেমি: মধ্যযুগের রসায়ন চর্চা যেখানে আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণ ছিলো
অ্যালকেমিস্ট: যারা অ্যালকেমি চর্চা করতেন তাদের অ্যালকেমিস্ট বলা হত
রসায়নের জনক: জাবির ইবনে হাইয়ান (পরীক্ষাগারে আলকেমি চর্চার সূচনা করেন)
আধুনিক রসায়নের জনক: অ্যান্টনিও ল্যাভয়সিয়ে
রসায়ন: প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের যে শাখা পদার্থের অভ্যন্তরীণ গঠন, উপাদান, ধর্ম, রূপান্তর ও রূপান্তরে শক্তির পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে
বহিঃসংযোগ:
উইকিপিডিয়া - Antoine Lavoisier