পদার্থ: যার নির্দিষ্ট ভর আছে এবং জায়গা দখল করে।

আমরা সকলেই জানি, পদার্থের তিনটি অবস্থা আছে- কঠিন, তরল ও গ্যাসীয়। কক্ষ তাপমাত্রায় বিভিন্ন পদার্থ বিভিন্ন অবস্থায় থাকে। তাপমাত্রা পরিবর্তনের সাথে একই পদার্থের অবস্থা পরিবর্তন হয়। যেমন- তাপমাত্রা বাড়াতে থাকলে কঠিন পদার্থ তরলে এবং তরল পদার্থ গ্যাসীয় পদার্থে পরিণত হয়।

[কক্ষ তাপমাত্রা বা room temperature বলতে আমাদের আশেপাশের সাধারণ তাপমাত্রা বোঝায়। রসায়নে কক্ষ তাপমাত্রার মান 25°C ধরা হয়।]

আন্তঃকণা আকর্ষণ বল

পদার্থের এই তিনটি অবস্থা বুঝতে হলে আমাদের আন্তঃকণা আকর্ষণ বলের ধারণা বুঝতে হবে। পদার্থের বিভিন্ন কণা (পরমাণু, অণু প্রভৃতি) এর মধ্যে এক ধরণের আকর্ষণ বল কাজ করে। একে আন্তঃকণা আকর্ষণ বল বলে।

কঠিন পদার্থের আন্তঃকণা আকর্ষণ বল সবচেয়ে বেশি। ফলে কণাগুলো খুব কাছাকছি অবস্থান করে, এবং তাদের অবস্থান নির্দিষ্ট থাকে। নির্দিষ্ট অবস্থানে কণাগুলোর একরকম কম্পন থাকে, তবে নিজের স্থান পরিবর্তন করতে পারে না। ফলে কঠিন পদার্থের আকার নির্দিষ্ট থাকে। চাপ প্রয়োগে সেভাবে সংকোচন হয় না।

অন্যদিকে তরল পদার্থের আন্তঃকণা আকর্ষণ বল তুলনামূলক কম। ফলে কণাগুলো এদিক-ওদিক যেতে পারে এবং যে পাত্রে রাখা হয়, তার আকার ধারণ করে। তবে কণাগুলো একবারে মুক্ত হয়ে যায় না, নির্দিষ্ট আয়তন বজায় রাখার মত যথেষ্ট আন্তঃকণা আকর্ষণ বল থাকে। চাপ প্রয়োগে সংকোচন প্রায় হয় না। তবে তাপ প্রয়োগে আয়তন বৃদ্ধি পায়।

গ্যাসীয় পদার্থের আন্তঃকণা আকর্ষণ বল খুবই কম হয়। তাই কণাগুলো প্রায় মুক্তভাবে বিভিন্নদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। যে পাত্রে রাখা হয়, তার সম্পূর্ণ আয়তন দখল করে। চাপ প্রয়োগে গ্যাসীয় পদার্থের আয়তন অনেক কমে যায়। আবার তাপ প্রয়োগে আয়তন অনেক বৃদ্ধি পায় (অর্থাৎ, কণাগুলো আরো ছড়িয়ে যায়)।

পদার্থের অবস্থাআন্তঃকণা আকর্ষণ বলআকারআয়তনচাপ প্রয়োগে সংকোচনতাপ প্রয়োগে প্রসারণ
কঠিনবেশিনির্দিষ্টনির্দিষ্টপ্রায় নেইকম
তরলমধ্যমনির্দিষ্ট নানির্দিষ্টপ্রায় নেইবেশি
গ্যাসীয়খুব কমনির্দিষ্ট নানির্দিষ্ট নাবেশিঅনেক বেশি

পদার্থের এই তিন অবস্থাকে কণার গতিতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

কণার গতিতত্ত্ব

কণার গতিতত্ত্ব: কণাগুলোর গতিশক্তি ও আন্তঃকণা আকর্ষণ শক্তি দিয়ে পদার্থের তিনটি অবস্থাকে ব্যাখ্যা করে এমন একটি তত্ত্ব।

কণার গতিতত্ত্ব অনুযায়ী পদার্থের কণাগুলো সর্বদা গতিশীল থাকে। এমনকি কঠিন পদার্থেও। কণাগুলো যত কাছাকাছি থাকে, আন্তঃকণা আকর্ষণ শক্তি তত বেশি হয়। কঠিন পদার্থের কণাগুলো খুব কাছাকাছি থাকায় আন্তঃকণা আকর্ষণ খুবই শক্তিশালী। তাই কঠিন পদার্থে কণাগুলো স্থায়ীভাবে জায়গা পরিবর্তন করতে পারে না। তবে নিজের জায়গায় কম্পনরত থাকে।

যখন কঠিন পদার্থে তাপ দেয়া হয়, তখন কণাগুলো তাপশক্তি গ্রহণ করে। তাপশক্তি আর গতিশক্তি খুবই গভীরভাবে সম্পর্কিত। মূলত কণাগুলোর কম্পনের সামগ্রিক গতিশক্তিই তাপশক্তি। তাপশক্তি গ্রহণের ফলে কণাগুলো আরো বেশি কাঁপতে থাকে। এতে কণাগুলোর মাঝে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি সম্ভব হয় এবং আন্তঃকণা আকর্ষণ শক্তি তুলনামূলক দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পদার্থ তরল অবস্থায় উপনীত হয়।

তরল পদার্থে আরো তাপ দেয়া হলে কণাগুলোর গতিশক্তি আরো বৃদ্ধি পায়। ফলে কণাগুলোর দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক পর্যায়ে আন্তঃকণা আকর্ষণ শক্তি এতটা দুর্বল হয়ে যায় যে কণাগুলো প্রায় মুক্তভাবে ছুটে বেড়াতে পারে। অর্থাৎ পদার্থ গ্যাসীয় অবস্থা লাভ করে।