সহজ উত্তর- রসায়নে আমরা নিয়ম বানাই না। আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করি প্রকৃতি কী কী নিয়ম মেনে চলছে।

এটা অনেকটা প্যাটার্ন খোঁজার মত। আমরা দেখি কোন প্যাটার্নগুলো প্রকৃতিতে হচ্ছে, এবং সেটাকে বলি নিয়ম। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের বুঝমত নিয়ম মানার জন্য তো বসে নেই, প্রকৃতি তার নিজের মত সব নিয়ম ঠিকঠাক মেনে চলে। নিয়মের ব্যতিক্রম যা কিছু আছে, সেগুলো প্রকৃতির সব নিয়ম মেনেই হচ্ছে। কিন্তু হয়ত আমরা সে নিয়মগুলো এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি, অথবা আমরা আলোচনা সহজ রাখার সুবিধার্থে সব নিয়মকে আলোচনায় আনিনি।

আউফবাউ নীতি, হুন্ডের নীতি - এই নীতিগুলো এমন কেন তুমি যদি জিজ্ঞেস কর, একটাই উত্তর, কারণ প্রকৃতিতে আমরা এমনটাই দেখেছি। এই নীতিগুলোর ব্যতিক্রম আছে কেন তুমি যদি জিজ্ঞেস কর, সেই একই উত্তর, কারণ প্রকৃতিতে আমরা তেমনটাই দেখেছি।

হয়ত কিছু কিছু প্রশ্নের কিছুটা গভীরে আমরা যেতে পারবো। এবং সেটাই আমাদের লক্ষ্য। ক্রমশ আরো বেশি মৌলিকভাবে বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করা। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে আমাদের বলতে হয়, এটা এমন- কারণ প্রকৃতিতে এটা এমনভাবেই হয়।

তবে আমাদের চূড়ান্ত টার্গেট হলো প্রকৃতিকে আরো মৌলিকভাবে বোঝা।

রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলোর সবচেয়ে মৌলিক একটা দিক আমরা বোধহয় বলতে পারি সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছানোর চেষ্টা। বলা যায় এটাই সব রাসায়নিক পদার্থের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য। স্থিতিশীল জায়গাতে যাওয়া। যেমন- নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলো ‘সাধারণত’ বিক্রিয়া করে না, কারণ তাদের বিন্যাস স্থিতিশীল। আর অন্য সব মৌল চেষ্টা করে নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মত বিন্যাসে পৌঁছাতে, যার জন্য তারা বিক্রিয়া করে।

খেয়াল কর, ওপরের কথাতে ‘সাধারণত’ শব্দটা বলেছি। মানে হলো নিষ্ক্রিয় গ্যাসও বিশেষ পরিস্থিতিতে বিক্রিয়া করতে পারে। উপস্থিত রাসায়নিক পদার্থ, তাপমাত্রা, ঘনমাত্রা, বন্ধনশক্তি অনেক কিছু স্থিতিশীলতার সাথে জড়িত। যেকারণে একই বিক্রিয়ক ভিন্ন পরিবেশে ভিন্নভাবে বিক্রিয়া করে।

এখন আমরা যদি শুরুতেই আমাদের জানা সবকিছুকে প্যাটার্নে আনার চেষ্টা করি, আমাদের বোঝা বা বাস্তব জীবনে ব্যবহারের জন্য তা খুবই কঠিন একটা অবস্থা তৈরি করবে। আর সাথে আমাদের না জানা একটা জগৎ তো আছেই। এজন্য আমাদের কিছুটা সিমপ্লিফিকেশন দরকার হয়। আর যখন আমরা সিমপ্লিফিকেশন করি, কিছু সূক্ষ্ম বিষয় স্বাভাবিকভাবে বাদ পড়ে যায়, যেগুলোকে আমরা তখন প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করি।

এখানে আরেকটা দিক হলো পরমাণু-অণু, এরকম ক্ষুদ্র জিনিসগুলো নিয়ে আমরা যখন কাজ করি, তখন সেগুলো কিন্তু আমরা সরাসরি চোখে দেখতে পাই না। বিভিন্ন পরীক্ষণ এবং পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি যে সেগুলোর প্রকৃতি কীরকম। বলা যায় অনেক ক্ষেত্রেই আমরা শুধু আমাদের বেস্ট গেস করতে পারি।

যেমন- ১৯১১ সালে রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলে প্রথম পরমাণুর কেন্দ্রে নিউক্লিয়াসের ধারণা দেন। রাদারফোর্ড কিন্তু নিউক্লিয়াস মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখেননি। তখনকার সময়ে তো নয়ই, এখনকার সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি দিয়েও এটা সম্ভব না। রাদারফোর্ড পরীক্ষা করে দেখেছেন ধনাত্মক চার্জযুক্ত আলফা কণা বেশিরভাগ সময়ে সরাসরি স্বর্ণের পাতের মধ্য দিয়ে চলে যায়, অল্প কিছু সময় বেঁকে যায় বা বিপরীত দিকে ফিরে আসে। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি বললেন পরমাণুর কেন্দ্রে ধনাত্মক চার্জযুক্ত ভারি নিউক্লিয়াস আছে এবং ইলেকট্রন তার আশেপাশে ফাঁকা জায়গায় ঘোরে।

রাদারফোর্ডের মডেল কি পরমাণুর প্রকৃত চিত্র সত্যিকারার্থে ব্যাখ্যা করতে পারে? না, পারে না। কিন্তু এটা কি এই মডেলের ব্যর্থতা? না। বরং তার নিজের এবং তার পূর্ববর্তীদের বিভিন্ন পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করতে পারে এমন সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা নিয়ে আসা এটাই রাদারফোর্ড মডেলের সাফল্য। এজন্য আমরা মডেলটাকে ‘ভুল’ বলি না, আমরা বলি এর ‘সীমাবদ্ধতা’ আছে।

রাদারফোর্ডের পর এখন পর্যন্ত যত আধুনিক মডেল এসেছে, মৌলিকভাবে এই কথাটা কিন্তু সবগুলোর জন্যই সত্য। আমরা আধুনিক পরীক্ষণগুলোতে দেখেছি পরমাণু-অণু বা ক্ষুদ্র কণাগুলোর আচরণ আমাদের সাধারণ জীবনের পর্যবেক্ষণ থেকে যেরকম আমরা এক্সপেক্ট করব, তার থেকে আলাদা হয়।

আমরা এই বিষয়গুলো আরো গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছি। তবে যতক্ষণ না একদম প্রকৃত চিত্র বুঝবো, ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যতিক্রম থেকেই যাবে। কিন্তু সত্যি বলতে সম্ভবত সে দিনটি কখনোই আসবে না যেদিন প্রকৃতির সব রহস্য আমাদের কাছে উন্মোচিত হবে। দিনশেষে আমাদের পর্যবেক্ষণগুলো থেকে অঙ্ক মেলাবার চেষ্টা- এটুকুই যে আমরা করতে পারি!