গতি সংক্রান্ত গাণিতিক সূত্র
অনেকগুলো গাণিতিক সূত্র তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা গাণিতিক সমস্যাগুলোকে সহজ করার জন্য সচারচর আমাদের সামনে আসে এরকম গাণিতিক সম্পর্কগুলোকে সূত্র আকারে মনে রাখি। সূত্রগুলোতে বিভিন্ন রাশি, যেমন- বেগ, সরণ, ত্বরণ প্রভৃতিকে আমরা কিছু প্রতীক দিয়ে প্রকাশ করি।
হয় কী, পদার্থবিজ্ঞান শুরু করেই একের পর এক সূত্র আসতে দেখে অনেকেই একটু হকচকিয়ে যায় শুরুতে। তো প্রথমত, ভয় পাওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, শুরুতেই সবকিছু মুখস্থ করার চেষ্টা করা যাবে না। তবে সূত্রগুলো কী বোঝাচ্ছে এটা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আর খাতায় লিখতে হবে, শুধু পড়ে গেলে হবে না।
পরে আমরা যখন বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে থাকবো, শুরুর দিকে প্রয়োজনমত সূত্রগুলো সামনে রাখতে পারো। আস্তে আস্তে সূত্রগুলোর সাথে আমাদের সখ্যতা হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ। এভাবে পর্যায়ক্রমে সূত্রগুলো আয়ত্ত্বে আনতে হবে।
সামনের আলোচনাতে যে প্রতীকগুলো ব্যবহার হবে, সেগুলো এক নজরে দেখে নিই-
ত্বরণ থাকলে,
আদিবেগ (যাত্রাপথের শুরুতে বেগ), u
শেষবেগ (যাত্রাপথের শেষে বেগ), v
গড়বেগ, V
সমবেগে চললে,
বেগ, v
সরণ, s
ত্বরণ, a
সময়, t
একটা বস্তুটা যদি ত্বরণ থাকে, তাহলে যাত্রাপথে বেগ পরিবর্তন হবে। এজন্য আদিবেগ আর শেষবেগ বোঝাতে আলাদা দুটো প্রতীক আমরা ব্যবহার করি। আমরা এখানে সরণ, বেগ কথাগুলো বললেও ভেক্টর চিহ্ন ব্যবহার করছি না। কারণ আমরা সব গতি একই সরলরেখায় ধরে নিবো, দিক নিয়ে কাজ করব না।
প্রতীকের ব্যবহার বোঝার জন্য একটা উদাহরণ দেয়া যাক। একটা গাড়ি স্থির অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করে 2 ms-2 সমত্বরণে 5 ms-1 গড়বেগে ৫ সেকেন্ড সময়ে 25 m দূরত্ব অতিক্রম করে 10 ms-1 বেগে উপনীত হলো। তাহলে,
আদিবেগ, u = 0 (যেহেতু শুরুতে স্থির ছিলো)
শেষবেগ, v = 10 ms-1
গড়বেগ, V = 5 ms-1
সরণ, s = 25 m
ত্বরণ, a = 2 ms-2
সময়, t = 5 s
এভাবে আমরা কোন সমস্যা থেকে বিভিন্ন রাশির মানগুলোকে প্রতীক দিয়ে প্রকাশ করতে পারি।
ওপরের উদাহরণে আদিবেগ, শেষবেগ, গড়বেগ, সরণ, ত্বরণ, সময় সবগুলোর মান-ই বলা ছিলো। কিন্তু এদের মধ্যে কিছু সম্পর্ক আছে, তাই না? যেমন একটা গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছাতে কত সময় নিবে, এটা গাড়িটার বেগের ওপর নির্ভর করছে। তো সূত্রগুলোতে আমরা এরকম সম্পর্কগুলোই নিয়ে আসার চেষ্টা করব।
সমবেগে ও গড়বেগে চলমান বস্তুর t সময়ে সরণ নির্ণয়:
ধরা যাক, একটা বস্তু সমবেগে চলছে এবং বস্তুটার বেগ হলো v
তাহলে, 1 একক সময়ে সরণ = v
t একক সময়ে সরণ, s = vt
(পাশাপাশি দুটো রাশির প্রতীক থাকলে তারা গুণ আকারে আছে নির্দেশ করে। অর্থাৎ, vt অর্থ v × t)
যদি সমবেগে না চলে, তাহলে গড়বেগ জানলে আমরা একইভাবে প্রয়োগ করতে পারবো।
সেক্ষেত্রে, V গড়বেগে চললে, s = Vt
সূত্র : s = vt (সমবেগের ক্ষেত্রে) বা s = Vt (অসমবেগের ক্ষেত্রে)
যদি সরণের বদলে দূরত্ব, বেগের বদলে দ্রুতি বলা থাকে, তাহলেও আমরা একই প্রতীক ও সূত্র ব্যবহার করতে পারবো।
সমত্বরণে চলমান বস্তুর t সময় পর বেগ নির্ণয়:
মনে করিয়ে দিই, ত্বরণ হলো বেগের পরিবর্তনের হার। কোন বস্তুর যদি ত্বরণ থাকে, তাহলে বস্তুটার বেগ সময়ের সাথে পরিবর্তন হবে।
ধরা যাক শুরুতে কোন বস্তুর বেগ ছিলো u
এবং বস্তুটার ত্বরণ হলো a
তাহলে প্রতি একক সময়ে বেগ a পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে
t সময়ে বেগ বৃদ্ধি পাবে at
শুরুতে বেগ ছিলো u, t সময় পর বৃদ্ধি পেলো at পরিমাণ তাহলে t সময় পর বেগ যদি v হয়, v = u + at
সূত্র: v = u + at
খেয়াল কর, ত্বরণ, a = 0 হলে, v = u পাওয়া যাবে। মানে ত্বরণ না থাকলে আদিবেগ আর শেষবেগ একই থাকবে।
সমত্বরণে চলমান বস্তুর $t$ সময়ে সরণ নির্ণয়:
সমত্বরণে চলমান বস্তুর $t$ সময়ে গড়বেগ:
যাত্রা শুরুতে বেগ, $u$
$t$ সময় যাত্রা শেষে বেগ, $v = u + at$
সমত্বরণে চলার ক্ষেত্রে বেগ সুষমভাবে বৃদ্ধি পায়। এখানে মাঝপথে যে বেগ, সেটাই হবে গড়বেগ। শুরুর বেগ আর শেষের বেগের গড় করলেই আমরা গড়বেগ পেয়ে যাবো। কেন, এটার ব্যাখ্যা আমরা একদম শেষে পরিশিষ্ট অংশে দিয়েছি।
তাহলে গড়বেগ, $V = \frac{u + v}{2} = \frac{u + (u + at)}{2}$
বা, $V = \frac{2u + at}{2}$
বা, $V = \frac{2u}{2} + \frac{at}{2}$
বা, $V = u + \frac{1}{2}at$
সমত্বরণে চলমান বস্তুর $t$ সময়ে সরণ:
আমরা দেখে এসেছি, $V$ গড়বেগে চলার ক্ষেত্রে, $s = Vt$
এবং আমরা আরো দেখেছি সমত্বরণে চলমান বস্তুর গড়বেগ, $V = u + \frac{1}{2}at$
তাহলে $V$ এর মান $s = Vt$ তে বসিয়ে পাবো,
$s = \left(u + \frac{1}{2}at\right) \times t$
বা, $s = ut + \frac{1}{2}at^2$
সূত্র: $\boldsymbol{s = ut + \frac{1}{2}at^2}$
খেয়াল কর, যদি ত্বরণ না থাকে, আমাদের আদিবেগ আর শেষবেগ সমান, u = v তাহলে, এই সূত্রে a = 0 বসালে আমরা সমবেগের সূত্র পেয়ে যাচ্ছি। s = vt
সমত্বরণে চলমান বস্তুর বেগ, ত্বরণ ও দূরত্বের সম্পর্ক
আগের সবগুলো সূত্রে সময় রাশিটি রয়েছে। কোন কোন সমস্যায় আমাদের হয়ত সময়ের হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন হবে না। এজন্য আমরা আরেকটা সূত্র নিয়ে আসবো, যেখানে সময় রাশিটি থাকবে না।
$v = u + at$
$\Rightarrow v^2 = (u+at)^2$ [বর্গ করে]
$\Rightarrow v^2 = u^2 + 2uat + a^2t^2$
$\Rightarrow v^2 = u^2 + 2a\left(ut + \frac{1}{2}at^2\right)$
$\therefore$ $\boldsymbol{v^2 = u^2 + 2as}$
সূত্র: $\boldsymbol{v^2 = u^2 + 2as}$
গাণিতিক সূত্রগুলো একত্রে
এই পর্যন্ত আমাদের সামনে চারটি সূত্র এসেছে,
- $\boldsymbol{s = vt}$ বা $\boldsymbol{s = Vt}$
- $\boldsymbol{v = u + at}$
- $\boldsymbol{s = ut + \frac{1}{2}at^2}$
- $\boldsymbol{v^2 = u^2 + 2as}$
এই অধ্যায়ে আমাদের সূত্র মূলত এগুলোই। এরপর পড়ন্ত বস্তুর জন্য কিছু সূত্র আসবে, যেই সূত্রগুলো আসলে এই সূত্রগুলোরই বিশেষ রূপ।
সূত্রের প্রয়োগ করে গাণিতিক সমস্যার সমাধান:
আমরা সামনের দিকে আরো গাণিতিক সমস্যা নিয়ে আসবো। এখানে আমি খুব সহজ কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে গাণিতিক সূত্রগুলো কীভাবে প্রয়োগ করা যায় তার উদাহরণ দেখাবো।
প্রশ্ন: একটা গাড়ি 5 ms-1 বেগে চলছে। 10 s-এ সরণ কত হবে?
সমাধান:
বেগ, v = 5 ms-1
সময়, t = 10 s
সরণ, s = ?
আমরা জানি, s = vt
বা, s = 5 ms-1 × 10 s = 50 m
আমরা এই অঙ্কটা ঐকিক নিয়মেই করতে পারতাম। তবে এর মাধ্যমে সূত্র আমরা কীভাবে ব্যবহার করি, সেটা শিখলাম। আমরা প্রশ্ন থেকে শুরুতে যে রাশিগুলোর মান দেয়া আছে, এবং যে রাশির মান বের করতে হবে সেগুলো খুঁজে বের করি। এরপর দেখি, কোন সূত্র দিয়ে আমরা এই রাশিগুলোর সম্পর্ক নিয়ে আসতে পারি। এবং তারপর জানা রাশিগুলোর মান বসিয়ে অজানা রাশির মান বের করে আনি।
আরেকটা জিনিস খেয়াল কর, দূরত্বের একক m এটা তো আমরা জানতামই। কিন্তু বেগ আর সময়ের একক গুণ করলেও আমরা কিন্তু দূরত্বের একক পাচ্ছি। মানে, ${m \over s} \times s = m$। তারপরও এটা অনেক সময় একক নিয়ে কনফিউশন তৈরি করতে পারে। সহজ রাখার জন্য, আমরা সাধারণত মাঝের লাইনগুলোতে প্রত্যেকটা রাশির সাথে একক লিখি না, শেষে গিয়ে একবারে লিখি। মানে, s = 5 × 10 = 50 m এরকম।
প্রশ্ন: একটা গাড়ি $5 \text{ km h}^{-1}$ দ্রুতিতে চলছে। $10 \text{ s}$-এ অতিক্রান্ত দূরত্ব কত হবে?
সমাধান:
আমরা বলেছি যে দ্রুতি, বেগ এবং দূরত্ব, সময় এগুলোর মধ্যে আমরা কোন বৈষম্য করব না। একই প্রতীক, একই সূত্র। তবে এখানে দ্রুতি $\text{km h}^{-1}$ এ দেয়া, আর সময় $\text{s}$-এ। আমাদের এই দুটোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ এককে নিয়ে আসতে হবে। যেমন আমরা বেগকে $\text{km h}^{-1}$ থেকে $\text{m s}^{-1}$ এ রূপান্তর করতে পারি, অথবা সময়কে $\text{s}$ থেকে $\text{h}$-এ। এটা আমরা সূত্র প্রয়োগের আগেই করে নিতে পারি, অথবা সূত্রের মধ্যে রাশির এককসহ লিখে তারপর করতে পারি।
দ্রুতিকে $\text{km h}^{-1}$ থেকে $\text{m s}^{-1}$ এ রূপান্তর করে
দ্রুতি, $v = 5 \text{ km h}^{-1} = \frac{5 \times 1000}{3600} \text{ m s}^{-1} = 1.39 \text{ m s}^{-1}$
সময়, $t = 10 \text{ s}$
দূরত্ব, $s = ?$
আমরা জানি, $s = vt$
বা, $s = 1.39 \times 10 = 13.9 \text{ m}$
সময়কে $\text{s}$ থেকে $\text{h}$ এ রূপান্তর করে
দ্রুতি, $v = 5 \text{ km h}^{-1}$
সময়, $t = 10 \text{ s} = \frac{10}{3600} \text{ h} = 0.00278 \text{ h}$
দূরত্ব, $s = ?$
আমরা জানি, $s = vt$
বা, $s = 5 \times 0.00278 = 0.0139 \text{ km}$
[খেয়াল কর, 0.0139 km = 13.9 mG অর্থাৎ ভিন্ন এককে থাকলেও আমাদের উত্তর কিন্তু একই আছে।]
সূত্রের মধ্যে রাশির একক রূপান্তর করে
ওপরের উদাহরণগুলোতে আমরা সূত্রে প্রয়োগের আগেই রাশিগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ এককে নিয়ে এসেছি। আমরা সূত্রে প্রয়োগের পরও সেটা করতে পারতাম। সেক্ষেত্রে আমাদের মাঝের লাইনগুলোতেও এককসহ লিখতে হবে।
আমরা জানি,
$s = vt$
বা, $s = 5 \text{ km h}^{-1} \times 10 \text{ s} = 5 \times 10 \times \frac{\text{km}}{\text{h}} \times \text{s} = 5 \times \frac{1000 \text{ m}}{3600 \text{ s}} \times 10 \text{ s} = 5 \times \frac{1000}{3600} \times 10 \text{ m} = 13.9 \text{ m}$
প্রশ্ন: একটা গাড়ি 10 s-এ 50 m পথ পাড়ি দিলো। যাত্রাপথে গড়বেগ কত?
সমাধান:
সরণ, s = 50 m
সময়, t = 10 s
গড়বেগ, V = ?
$s = Vt$ বা, $50 = V × 10$ বা, $V×10 = 50$ বা, $V={50 \over 5}$ বা, $V = 10 \text { ms}^{-1}$
আমরা বীজগণিতে যেরকম পক্ষান্তর, কাটাকাটি করে সমীকরণ সমাধান করতে শিখেছি, সূত্র থেকে অজানা রাশির মান আমরা একইভাবে বের করে আনতে পারবো।
পরিশিষ্ট
সমত্বরণে চলমান বস্তুর গড়বেগ নির্ণয়ের জন্য আমরা শুরুর বেগ আর শেষের বেগের গড় নিয়েছিলাম। প্রশ্ন আসবে, শুরুর বেগ আর শেষের বেগের গড় করে কীভাবে পুরো যাত্রাপথের গড় পাওয়া সম্ভব?
চিন্তা করতে পারো, যদি যাত্রার ঠিক মাঝপথে বেগ V থাকে, আর প্রত্যেক সেকেন্ডে বেগ a করে বেগ বাড়ে, তাহলে:
মাঝপথ থেকে 1 সেকেন্ড আগে বেগ ছিলো V - a
মাঝপথে বেগ V,
মাঝপথ থেকে 1 সেকেন্ড পরে বেগ V + a
আমরা যদি এই তিনটা বেগের গড় করি, = $\frac{V - a + V + V + a}{5} = \frac{3V}{3} = V$একইভাবে মাঝপথ থেকে 2 সেকেন্ড আগে ও পরের বেগ যথাক্রমে V - 2a ও V + 2a
এই পাঁচটি বেগের গড় করলে হবে: = $\frac{V - 2a + V - a + V + V + a + V + 2a}{5} = \frac{5V}{5} = V$তো এরকমভাবে যেকোন সংখ্যক বিন্দু নিয়ে আমরা দেখাতে পারবো যে তাদের গড় মাঝপথের বেগের সমান হবে। মাঝপথ, তার থেকে আগে n সংখ্যক, পরে n সংখ্যক এরকম মোট 2n+1 সংখ্যক নিয়ে আমরা নিচের মত করে দেখাতে পারি,
$\frac{V-na+…+V-3a+V-2a+V-a+V+V+a+V+2a+V+3a+…+V+na}{2n+1} = \frac{(2n+1)V}{2n+1} = V$
মাঝপথ থেকে সমান সময় আগে-পরে থাকা যেকোন দুটো বিন্দুর বেগ যেহেতু সমান পরিমাণে কমবেশি, এজন্য আমরা এরকম যেকোন দুটো বিন্দুর গড় নিলেই এই বেগটা পেয়ে যাবো। ধর, যাত্রার মোট সময় t হলে, মাঝপথ পর্যন্ত সময় হলো $t\over2$। তাহলে, শুরুতে বেগ ছিলো $V-a\frac{t}{2}$ , আর শেষে $V+a\frac{t}{2}$, গড়ে আমরা V পেয়ে যাবো।
কঠিন মনে হচ্ছে? আমরা পদার্থবিজ্ঞান কেবল শুরু করছি, এখনো এরকম জিনিসগুলো আমাদের জন্য বেশ নতুন। যতটুকু বুঝেছো, আপাতত ততটুকুই থাকুক। পরে অন্য কোন সময়ে আরেকবার বোঝার চেষ্টা করতে পারো। আর পরীক্ষাতে এরকম প্রশ্ন আসবে না, সেই ভয় নেই!