অভিকর্ষজ ত্বরণের ধারণা ও পড়ন্ত বস্তুর সূত্র
মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বলকে মহাকর্ষ বল বলে।
অভিকর্ষ বল/মাধ্যাকর্ষণ বল: পৃথিবী কোন বস্তুকে যে বলে আকর্ষণ করে, তাকে অভিকর্ষ বল বলে।
অভিকর্ষজ ত্বরণ/মাধ্যাকর্ষণজনিত ত্বরণ: অভিকর্ষ বলের কারণে বস্তুতে সৃষ্ট ত্বরণকে মাধ্যাকর্ষণজনিত ত্বরণ বলে।
অভিকর্ষজ ত্বরণকে g দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
অভিকর্ষ বলের কারণে বিনা বাধায় পড়ন্ত কোন বস্তুতে ত্বরণ সৃষ্টি হয়। যেমন, আমরা যদি মাটির কাছ থেকে একটা বল ছেড়ে দিই, সেটা আস্তে মাটিতে পড়বে। আর যদি ওপর থেকে ছাড়ি, তাহলে জোরে মাটিতে পড়বে। অর্থাৎ, পড়তে থাকা বস্তুতে একটা ত্বরণ থাকে। পৃথিবীপৃষ্ঠের কোন নির্দিষ্ট জায়গাতে অভিকর্ষজ ত্বরণের মান সকল বস্তুর জন্য সমান।
পৃথিবী যেহেতু সুষম গোলক না, অঞ্চলভেদে অভিকর্ষজ ত্বরণের মানে একটু তারতম্য হয়। মেরু অঞ্চলে অভিকর্ষজ ত্বরণের মান 9.83 ms-2 এবং বিষুব অঞ্চলে 9.78 ms-2। এছাড়া পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা বা গভীরতায় গেলে অভিকর্ষজ ত্বরণের মানে তারতম্য আসবে।
আমরা পৃথিবীপৃষ্ঠের কাছাকাছি অভিকর্ষজ ত্বরণের মান g = 9.8 ms-2 ব্যবহার করব।
গ্যালিলিওর সূত্র
বাস্তবে বাতাসের বাঁধা এবং অন্যান্য প্রভাব থাকে। যেমন- একটা কাগজের পাতা এমনিতে ধীরে মাটিতে পড়বে, কিন্তু সেই একই কাগজ ভাজ করে বা মুড়িয়ে ফেললে দ্রুত পড়বে। এর কারণ পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল যত বেশি, বাতাসের বাঁধা তত বেশি কাজ করবে।
তবে যদি বাতাস বা অন্য কোন প্রভাব না থাকে, স্থির অবস্থান থেকে বিনা বাধায় পড়ন্ত বস্তু নিয়ে গ্যালিলিও কিছু পরীক্ষার ভিত্তিতে তিনটি সূত্র প্রদান করেন-
প্রথম সূত্র: স্থির অবস্থান ও একই উচ্চতা থেকে বিনা বাধায় পড়ন্ত বস্তু সমান সময়ে সমান পথ অতিক্রম করবে। দ্বিতীয় সূত্র: স্থির অবস্থান থেকে বিনা বাধায় পড়ন্ত বস্তুর নির্দিষ্ট সময়ে (t) প্রাপ্ত বেগ (v) ঐ সময়ের সমানুপাতিক। অর্থাৎ v ∝ t তৃতীয় সূত্র: স্থির অবস্থান থেকে বিনা বাধায় পড়ন্ত বস্তু নির্দিষ্ট সময়ে যে দূরত্ব (h) অতিক্রম করে তা ঐ সময়ের (t) বর্গের সমানুপাতিক। অর্থাৎ h ∝ t²
প্রথম সূত্র মূলত বলছে একটা সোজা কাগজের পাতা, আর মোড়ানো কাগজের পাতা কিংবা একটা পালক আর একটা ইট স্থিরভাবে ছেড়ে দিলে সমান গতিতে পড়বে, যদি কোন বাধা কাজ না করে।
আমরা গতির চারটি সূত্র নিয়ে এসেছিলাম।
- $\boldsymbol{s = vt}$ বা $\boldsymbol{s = Vt}$
- $\boldsymbol{V = \frac{(u+v)}{2}}$
- $\boldsymbol{v = u + at}$
- $\boldsymbol{s = ut + \frac{1}{2}at^2}$
- $\boldsymbol{v^2 = u^2 + 2as}$
পড়ন্ত বস্তুর ক্ষেত্রে ত্বরণ, a হিসেবে অভিকর্ষজ ত্বরণ, g কাজ করবে। এবং পড়ন্ত বস্তু ক্ষেত্রে পাঠ্যবইগুলোতে s এর পরিবর্তে h (height) ব্যবহার করা হয়।
সমবেগের সূত্র পড়ন্ত বস্তুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে না। শেষের তিনটি সূত্রতে পড়ন্ত বস্তুর ক্ষেত্রে a এর জায়গায় g এবং s এর জায়গায় h বসালে আমরা পড়ন্ত বস্তুর সূত্রগুলো পেয়ে যাবো।
- $\boldsymbol{v = u + gt}$
- $\boldsymbol{h = ut + \frac{1}{2}gt^2}$
- $\boldsymbol{v^2 = u^2 + 2gh}$
আমরা যদি প্রথম ও দ্বিতীয় সূত্রে স্থির অবস্থান থেকে যাত্রা শুরু, অর্থাৎ u = 0 বসিয়ে দিই, তাহলে আমরা গ্যালিলিওর দ্বিতীয় ও তৃতীয় সূত্রের গাণিতিক রূপ পেয়ে যাবো, অর্থাৎ- v = gt, h = ½gt²
অভিকর্ষজ ত্বরণ পৃথিবীর কেন্দ্রে দিকে, তথা নিচের দিকে কাজ করে। যখন একটা বস্তু নিচের দিকে নামে, তখন অভিকর্ষজ ত্বরণ বেগের দিকে কাজ করে। কিন্তু, আমরা যদি ওপরের দিকে একটা বস্তু ছুড়ে দিই, তাহলে অভিকর্ষজ ত্বরণ বেগের বিপরীত দিকে কাজ করে। আমরা গাণিতিকভাবে তখন g এর সাথে ‘-’ চিহ্ন ব্যবহার করতে পারি।
ওপরের দিকে ছুঁড়ে দেয়া একটা বস্তুর ওপর নিচের দিকে ত্বরণ কাজ করাতে এর বেগ ক্রমশ কমতে থাকে এবং যাত্রাপথের সর্বোচ্চ উচ্চতায় যেয়ে 0 হয়। এরপর পতনের সময় 0 থেকে আবার বাড়তে থাকে (কারণ পতনের সময় বেগ আর অভিকর্ষজ ত্বরণ দুটোই নিচের দিকে) এবং যে বিন্দুতে ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিলো সেখানে আসতে আসতে ঠিক ছুঁড়ে দেয়ার সময়ের বেগে উপনীত হয়।
তাহলে ভূমি থেকে u বেগে বস্তুকে সোজা ওপরে ছুঁড়ে দিলে-
উত্থানের সময়- আদিবেগ u, শেষবেগ v = 0, ত্বরণ = -g
পতনের সময়- আদিবেগ 0, শেষবেগ v = u, ত্বরণ = g
এই জিনিসগুলো যদি এখন কনফিউজিং লাগে, একটু কষ্ট করে মোটামুটিভাবে বুঝে বুঝে আগাতে থাকো। সবকিছু যে প্রথমবার পড়ে মনে রাখতে হবে এরকম না। পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমাদের অনেক বেশি গাণিতিক সমস্যার সমাধান চর্চা করতে হবে, যত চর্চা করব, আমাদের জিনিসগুলো তত ভালোভাবে আয়ত্ত্ব হবে।
ছুঁড়ে দেয়া বস্তুর সর্বোচ্চ উচ্চতা, উত্থানকাল, পতনকাল ও উড্ডয়নকাল: ধরা যাক, স্থির অবস্থান থেকে u বেগে একটি বস্তু ওপরে ছুঁড়ে দেয়া হলো। বস্তুটি t সময়ে H উচ্চতা পর্যন্ত উঠলো, এরপর নিচের দিকে পড়তে শুরু করলো।
সর্বোচ্চ উচ্চতা নির্ণয়ের জন্য আমরা $\boldsymbol{v^2 = u^2 + 2gh}$ সূত্রটি ব্যবহার করব। কিন্তু, এখানে বস্তুটা ওপরের দিকে ওঠার সময় g এর পরিবর্তে -g হবে। এবং আমরা সর্বোচ্চ উচ্চতা বোঝাতে H প্রতীক ব্যবহার করি। আমরা একটু আগে ব্যাখ্যা করেছি, সর্বোচ্চ উচ্চতায় বেগ 0 হয়।
তাহলে,
v² = u² - 2gH বা, 0 = u² - 2gH বা, $\boldsymbol{H = \frac{u^2}{2g}}$
সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠতে প্রয়োজনীয় সময় (উত্থানকাল) নির্ণয়ের জন্য, v = u - gt বা, 0 = u - gt বা, $\boldsymbol{t = \frac{u}{g}}$
সর্বোচ্চ উচ্চতা থেকে নামতে প্রয়োজনীয় সময় অর্থাৎ পতনকাল উত্থানকালের সমান হবে। আমরা গাণিতিকভাবেও দেখতে পারি। সর্বোচ্চ উচ্চতাতে আদিবেগ 0, এবং আমরা বলেছি ছুঁড়ে দেয়ার বিন্দু পর্যন্ত আসতে আসতে পুনরায় u বেগ প্রাপ্ত হবে। অর্থাৎ, শেষবেগ u হবে। এবং নিচে নামার সময় g ধনাত্মক নিব। তাহলে,
u = 0 + gt বা, $\boldsymbol{t = \frac{u}{g}}$
মোট যাত্রাপথের সময়কে উড্ডয়নকাল, T বলা হয়। অর্থাৎ, উড্ডয়নকাল = উত্থানকাল + পতনকাল = 2t
তাহলে, উড্ডয়নকাল, $\boldsymbol{T = \frac{2u}{g}}$
তাহলে আমরা আগের সূত্রগুলো থেকে তিনটি বিশেষ রূপ পেলাম,
- সর্বোচ্চ উচ্চতা, $\boldsymbol{H = \frac{u^2}{2g}}$
- উত্থানকাল = পতনকাল = $\boldsymbol{t = \frac{u}{g}}$
- উড্ডয়নকাল, $\boldsymbol{T = \frac{2u}{g}}$
যদি তুমি কনসেপ্টগুলো বুঝে থাকো, তুমি দেখবে এই অধ্যায়ের জন্য অনেক অনেক সূত্র তোমার আলাদাভাবে মনে রাখতে হচ্ছে না। কোন সূত্র ভুলে গেলেও তুমি চিন্তা করে সূত্রটা নিয়ে আসতে পারবে।
$\boldsymbol{s = vt}$ বা $\boldsymbol{s = Vt}$
$\boldsymbol{V = \frac{(u+v)}{2}}$
$\boldsymbol{v = u + at}$
$\boldsymbol{s = ut + \frac{1}{2}at^2}$
$\boldsymbol{v^2 = u^2 + 2as}$
$\boldsymbol{v = u + gt}$
$\boldsymbol{h = ut + \frac{1}{2}gt^2}$
$\boldsymbol{v^2 = u^2 + 2gh}$
$\boldsymbol{H = \frac{u^2}{2g}}$
$\boldsymbol{t = \frac{u}{g}}$
$\boldsymbol{T = \frac{2u}{g}}$