বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (Scientific Method)
বিজ্ঞানে আমাদের উদ্দেশ্য হলো প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন করা এবং সেই প্রশ্নের উত্তর পর্যন্ত পৌঁছানো। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পক্ষপাত ছাড়া কোন ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন ও ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টার পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বলে।
এখন সব বৈজ্ঞানিক গবেষণা একইভাবে বা একই ক্রমানুসারে হয় না। তবে সাধারণভাবে পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ এরকম ধাপগুলো একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলের জন্য পার করে আসতে হয়। সাধারণ ধারণা দিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে কয়েকটি ধাপে দেখানো যেতে পারে-
১. প্রশ্ন বা সমস্যা উত্থাপন: আমাদের গবেষণার শুরু সাধারণত হয় একটা প্রশ্ন বা সমস্যা বা কৌতুহলের জায়গা থেকে।
২. বিদ্যমান তথ্য ও রিসোর্স সংগ্রহ: বিজ্ঞান একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। হতে পারে আমাদের আগেই কেউ এমন কিছু গবেষণা করে গেছে যা আমাদের প্রশ্নের উত্তর পর্যন্ত পৌঁছানোকে অনেকটা সহজ করে দিবে। তো আমরা চেষ্টা করব আমাদের কাজে লাগতে পারে, এমন কী কী জিনিস আগে থেকেই এভেইলেবল আছে।
৩. সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বা অনুকল্প (Hypothesis) প্রণয়ন: একটা গবেষণায় পরীক্ষাপদ্ধতি কীভাবে সাজাতে হবে বা পরীক্ষার সময়ে কী কী পরিমাপ করতে হবে এরকম বিষয়গুলো ঠিক করতে হলে আমাদের একটা প্রাথমিক অনুমান দরকার হতে পারে। আমাদের বোধবুদ্ধি বা পূর্বের গবেষণাগুলোর আলোকে আমরা একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যাতে আসতে পারি, যেটাকে আমরা বলি হাইপোথিসিস। মূলত আমাদের পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্য হলো এই হাইপোথিসিস যাচাই করে দেখা।
৪. পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও উপাত্ত সংগ্রহ আমরা যে অনুমান করেছি, সেটার সত্যতা কীভাবে যাচাই করা যায়, তার জন্য উপযোগী করে আমাদের পরীক্ষণ সাজাতে হবে এবং সেখান থেকে আমাদের পর্যবেক্ষণের আলোকে উপাত্ত নথিবদ্ধ করতে হবে।
৫. প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ: পরীক্ষণের ফলাফল থেকে আমরা প্রয়োজনমত বিশ্লেষণ করি অনুমানকৃত সম্ভাব্য ফলাফলের সাথে মিলছে কিনা বোঝার জন্য। বিশ্লেষণের জন্য আমাদের যুক্তি বা রিজনিংয়ের প্রয়োজন হয়। যেমন আমরা
৬. উপসংহারে পৌঁছানো: আমরা যে হাইপোথিসিস থেকে শুরু করেছিলাম, প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে সেটা সঠিক বা ভুল দুরকম সিদ্ধান্তেই পৌঁছাতে পারি অথবা সুনিশ্চিত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত আসার মত যথেষ্ট উপাত্ত না-ও পেতে পারি। তো গবেষণার উপসংহার সবরকমই হতে পারে, আমাদের হাইপোথিসিস যদি আমাদের প্রশ্নের সঠিক ব্যাখ্যা না হয়, এটা খুঁজে আনতে পারাও গবেষণার সার্থকতা।
আবার, আমাদের পরীক্ষণের মধ্যে নতুন কোন ইনসাইট উঠে আসতে পারে, যেটা হয়ত আগের পরীক্ষণে আমরা মাথায় রাখিনি। সে অনুযায়ী আমরা নতুন কোন হাইপোথিসিসে পৌঁছাতে পারি এবং সে অনুযায়ী নতুনভাবে পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ প্রভৃতি সাজাতে পারি। তো এরকম তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ ধাপগুলো আমাদের পুনরাবৃত্তিমূলকভাবে পার করতে হতে পারে।
৭. ফলাফল প্রকাশ: আমাদের পরবর্তীরা যেন এই পরীক্ষণ থেকে উপকৃত হতে পারে, বা পরবর্তী গবেষকরা যেন এখান থেকে আরো এগিয়ে নিতে পারে, সেজন্য ফল প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ।
তবে এখানেই শেষ না। প্রায় ক্ষেত্রেই আমাদের ফলাফল চূড়ান্ত কথা বলতে পারে না। তাই, এরপর যত বেশি পুনঃপরীক্ষণ, আরো বেশি উপাত্ত নিয়ে কাজ করা যাবে, সঠিক ফলাফলে উপনীত হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি থাকবে। প্রায়সই অন্যান্য গবেষকরা পূর্বের গবেষণার পুনরাবৃত্তি করে থাকেন বা একটু ভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করে দেখেন।
আমাদের গবেষণার পর্যবেক্ষণ থেকে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে আরো পর্যবেক্ষণ করে তার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আমাদের পূর্বের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন বা পরিমার্জন আসতে পারে। বিজ্ঞান একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, এবং আমাদের জ্ঞান চূড়ান্ত নয়- এই স্বীকারোক্তি বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম শর্ত।